নিমগ্ন দৃশ্যের কবি নূরুল হক

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২১:০৬

সাতাত্তর বছর বয়স বহন করে গন্তব্যে ফিরে গেছেন কবি নূরুল হক। বলতে গেলে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন পেয়েছিলেন। জীবনভরা ছিল মান-অভিমান, আনন্দ-ব্যথা, হাসি-কান্না, উত্থান-পতন সবই। সঙ্গে ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম এক গভীর প্রশস্ত অপ্রকাশ্য কাব্যপথ; যা তিনি ভেতরে ভেতরে লালন করে এসেছেন। পরিণতি-অপরিণতি জেনেও তিনি সেই অপ্রকাশ্য পথের প্রকাশ্য পথিক হতে একটি জীবন কঠোর সংযম পালন করেছেন। কিন্তু একটা জীবন শিক্ষকতা করেছেন প্রকাশ্যে, সংসার করেছেন সাড়ম্বরে। কোনো কিছুতেই তিনি আড়াল দেখাননি। কিন্তু তিনি কেন এ পথ বেছে নিয়েছিলেন যে, তাঁর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত যে পথ তাতে তিনি এত সহজে প্রকাশ্য হবেন না? একেবারে জীবন দিয়েইবা তিনি আমাদের সেই সারপ্রাইজ কেন দিলেন? তাঁর এই গোপন অভিলাষ যে মৃত্যুর ভেতর দিয়েই পূরণ করে যেতে হবে, সেটাই তিনি ভাবতেন, হয়তো। সেটাই তিনি করেছেন, কারণ তিনি দেখাতে চেয়েছেন, জীবনের অনেক জটিল সমীকরণ মিলিয়েও সকলে সংসার করতে পারে, বৈষয়িক সাফল্য ছুঁতে পারে, কিন্তু কবিতা লিখতে পারে না। আবার কবিতাও অনেকে লিখতে পারেন, কিন্তু তাকে স্বকীয়তা দিতে পারেন না। যে কবিতার নিজস্ব ভাষা নেই, যে কবিতার একান্ত ডানা নেই, তা লিখে কী হবে! এমন করে ভাবতেন কবি নূরুল হক।

তাঁরই এক সতীর্থ কবি, ষাটের দশকের আরেক নিভৃত স্বর সিকদার আমিনুল হক এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, কবিতার জন্য একটি পরিপূর্ণ ভাষা এবং তার পরিণত প্রকাশ খুঁজে পেতেই তো একটা জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় ফুরিয়ে যায়। আর নূরুল হকের লেগেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জীবন। ১৯৪৪ সালে জন্ম নিয়ে, ষাটের দশকের একজন কবি হয়ে ২০০৭ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’। কী বিস্ময়কর ব্যাপার। এবং অনিবার্য সত্য যে, তাঁর আবির্ভাব অনেক বিলম্বে হলেও তাঁর প্রস্তুতি ছিল গোপনে গোপনে ভীষণ জোরালো এমনকি স্কুল জীবন থেকেই। তিনি আমাদের উপহার দিলেন এমন এক ভাষা, যা সমকালীন কবিতার ভাষাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সমসাময়িক কবিদের নিবিড় পাঠ্য তালিকায় জায়গা পায় তাঁর কবিতা। কিন্তু তিনি তা উপভোগ করতে শুরু করার আগেই তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যায়। তিনি অভিশম্পাত করেন পৃথিবীকে। বলেন, ‘এক নিমকহারাম / পৃথিবীতে / আমাদের দিন ফুরিয়ে যায়।’ আবার জীবনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাতে মানুষের মগ্নতাকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘জীবন এক অপূর্ব দৃশ্য / যা দেখে মানুষ / বাড়ি ফেরার কথা / ভুলে যায়।’ [পাদটীকা, একটি গাছের পদপ্রান্তে]। একথা বলতে দ্বিধা করব না যে, নূরুল হকের কবিতা ব্যাপক পাঠ শুরু হলে আমাদের ষাটের দশকের কবিতা ও কাব্যভাষার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। নূরুল হকের কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে সে ইঙ্গিত স্পষ্ট।

এমন সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত ভাষার মতোই সহজ ও দৃঢ়চেতা ছিলেন নূরুল হক। তাঁকে যেমন আবিষ্কার করা গেছে অনেক অনেক দেরিতে, তাঁর এই আড়ালের প্রস্তুতিও তাঁকে প্রযত্নে রেখেছিল তাঁর কবিতার স্বতন্ত্র ভাষার সন্ধানে। তিনি একান্ত এক মৌলিক ভাষার উপাসনা করেছেন, একান্ত এক কাব্যভুবনের নির্মাণে ডুব দিয়েছিলেন সংসার থেকে, কর্ম থেকে, কাব্যাঙ্গনের শোরগোল, ব্যতিব্যস্ততা থেকে। কিন্তু তা নিবিড় সুকৌশল ও সুচয়িত হয়েও ছিল কাব্যাঙ্গনের প্রাত্যহিকতার কিংবা স্বাভাবিকতার আড়ালে। অথচ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর, দেশের বড় বড় কলেজে করেছেন শিক্ষকতা, অগণিত ছাত্রছাত্রী তাঁর দেশ-বিদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি নিয়ে বসে আছেন। তিনি কি পারতেন না অত্যন্ত সরবে, অত্যন্ত আড়ম্বরে তাঁর সময়ের অন্য কবিদের মতো জাঁকজমকময় জীবন কাটাতে? কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, যেকোনো অর্জন ও সৃজনের মূলসূত্রটিই নিহিত থাকে মগ্নতায়, ধ্যানে। এ শিক্ষা ইতিহাসের, এ শিক্ষা নিয়তির। তিনি জীবনানন্দের ভাষায় সেই শিক্ষা নিয়েছেন ইতিহাস থেকে। পূর্ণতা দিয়েছেন অভিজ্ঞতা দিয়ে। আর তাঁর ফসল আমরা দু হাত ভরে তুলে নিতে পারি—‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’, ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’, ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’, ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা’, ‘এ জীবন খসড়া জীবন’, ‘কবিতা সমগ্র’ প্রভৃতি গ্রন্থের পাতা থেকে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, নেত্রকোনা জেলার কৃতি কবি ও মহত্প্রাণ শিক্ষক কবি নূরুল হক প্রায় দুই দশক ধরেই আমার প্রিয় কবির তালিকায়। তাঁর এই কাব্যনিমগ্নতাকে প্রণাম। সঙ্গে তাঁর সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনাকে জানাই লাল সালাম।

নূরুল হকের অপ্রকাশিত কবিতা

 

শর্তাধীন পঙিক্তগুলি

 

আরেকবার জন্ম নিলে

            তোমার পা দুটি আমি

                               ধুয়ে দেব

দোয়েল পাখির সারি দিয়ে,

যাতে দাঁড়াবার শক্তি পাও

                       বিজন জঙ্গলে

শিস দিতে দিতে,

বাংলাদেশের নামে

             চন্দ্রবিন্দু এঁকে দেব মনে

যাতে আলোকিত হয়ে ওঠে

                   তোমারই মুখখানি

অভিভূত রাতে।

 

 

সম্পাদ্য

 

আত্মার মুক্তির পুরোভাগে

             মানুষকে অবশ্যই

                  জেনে নিতে হবে

গতিরেখা,

হূদয়ের গানে

                  জেগে উঠতে হবে পথে

                                   নিশান উড়িয়ে

কলস্বরে ঐকতান ধরে।