শামস উজ জামান
আজকাল টেলিভিশনে প্রায়শই ছাদ-বাগানের তথ্যচিত্র চোখে আসে। এসব তথ্যচিত্রে দু’-দশটি ফুলের টব বা রঙের কৌটা কি অর্ধেক কাটা ড্রামে মাটি ভরে, কিছু গাছ-গাছালি লাগিয়ে ছাদে রাখার দৃশ্য দেখানো হয়। এ লেখনিতে আমি ফুলের টব, রঙের কৌটা বা অর্ধেক কাটা ড্রামে গাছ না লাগিয়ে দালানের ছাদের পুরো জায়গা জুড়ে চার-পাঁচ ইঞ্চি মাটি ফেলে সেখানে ফল-ফুল, আনাজ-তরকারি এবং লতা-গুল্মের বাগান করার কথা বলব।
আপনারা হয়ত ভাবছেন, সেকি! এভাবে পুরো ছাদে মাটি ফেলে বাগান বানালে, ছাদ স্যাঁতস্যেঁতে হয়ে ছাদটাই তো নষ্ট হয়ে যাবে। এমন প্রশ্ন আমি প্রায়ই শুনে থাকি। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। তবে এ ব্যাপারে আপনাদের একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে— ছাদে মাটি ফেলার আগে দেখে নিতে হবে ছাদের নিচে কোথাও কোনো ‘ড্যাম’ পড়েছে কিনা। ড্যাম হলে ভেবে নিতে হবে, শেষ ছাদ ঢালাইয়ের সময় আপনাদের ছাদের ঢালাই ভালো হয়নি এবং ছাদের কোনো-কোনো স্থানে ‘পোর’ বা সূক্ষ্ম ছিদ্র থেকে গেছে। এ অবস্থাটা বাগান বা বাগানবিহীন যেকোনো ছাদের জন্য ক্ষতিকর। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ছাদের ঢালাই ভালো হলে, সে ছাদের ওপরে সারাবছর পানি জমে থাকলেও সে পানি ছাদের ভেতরে গিয়ে ঢালাই বা ছাদের রড খারাপ করতে পারে না।
চলুন, এবার এই ‘পোর’ বা সূক্ষ্ম ছিদ্র থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজি।
আমার জানা মতে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সব থেকে ভালো এবং সহজ উপায় হবে দালানের ছাদের ‘ড্যাম পড়া’ স্থানগুলো ভেঙে ফেলে নতুনভাবে ঢালাই করে নেয়া। আমাদের মনে রাখা উচিত, ছাদে বাগান না বানালেও এসব স্থান মেরামত করে নেয়া জরুরি। নতুবা ছাদের ভেতরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে, ছাদের রডে মরিচা ধরে পুরো ছাদটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আরো দেখেছি, ছাদের ওপরে পাতলা করে ঢালাই দিয়ে বা আলকাতরা-রঙ লাগিয়ে কিংবা অন্য কোনো বাজারি ‘ট্রিটমেন্ট’ ব্যবহার করে কার্যত তেমন কোনো উপকার পাওয়া যায় না।
ছাদের সমস্যা শেষ হলে বাগান করার কাজ। আমি আমাদের দালানের সমস্ত ছাদজুড়ে প্রয়োজনমতো হাঁটার পথ (আড়াই ফুট চওড়া) এবং কিছু বসার জায়গা খালি রেখে (ছাদের নিচে যেসব স্থানে বাথরুম বা স্টোরের ওপরে ‘ফলস ছাদ’ আছে সে স্থানগুলোর ওপরে বসার স্থান রেখেছি) বাকি স্থানে দশ ইঞ্চি ইটের, পাঁচ ইঞ্চির দিকে খাড়া করে, বালি-সিমেন্ট দিয়ে একটার পর একটা ইট বসিয়ে বাগানের ‘বেড’ তৈরি করেছি। বেড তৈরি হয়ে গেলে বেডের ভেতরে ইঞ্চিচারেক উঁচু মাটি ফেলার কাজ। আমি দু’তিন ট্রাক বেলে মাটিতে কিছু ইউরিয়া সার মিলিয়ে সে মাটি ছাদ-বাগানের কাজে ব্যবহার করেছি। কম্পোস্ট সার, ঝুনা নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি কোকোপিট ইত্যাদি ব্যবহার করা আমার কাছে ‘কস্ট ইফেক্টিভ’ মনে হয় না। কারণ ছাদে শাকসবজি লাগিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করা অনেকটা ‘শখের তোলা আশি টাকার’ মতো। তাছাড়া, প্রচণ্ড রোদে নিয়মিত পানি দিয়ে রাখা, চড়ুই পাখি তাড়ানো— এসবও খুব ঝামেলার কাজ।
আমার নিজের বাগানের সমস্ত বেডজুড়ে ঘাস লাগিয়ে, এখানে-ওখানে কটা পেয়ারা, আপেল কুল, ছফেদা গাছসহ বাগান বিলাস, মাধবীলতা, ঝাউ, ব্লিডিং হার্ট, রঙ্গন-শেফালি-শিউলি ফুলের মতো স্থায়ী জাতের কিছু গাছ লাগিয়েছি। অপেক্ষাকৃত বড় গাছগুলো ঘাসের ওপরে ইটের টবে (টবের সাইজ— দু’ফুট পাশে, দেড় ফুট উঁচু) লাগিয়েছি। টবগুলোর নিচে দু’ইঞ্চি চওড়া একটি ফুটো দিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিকড় ঘাসের নিচে মাটির ভিতরে যেতে পারে। এ ব্যবস্থায়, এসব শিকড়গুলো মাটি থেকে যে পরিমাণ পানি শোষণ করে, তাতে গাছগুলো খুব বেশি উঁচু-লম্বা হতে পারে না। ছাদ-বাগানের গাছ ‘মহীরুহ’ হয়ে ওঠা ঠিক নয়। সেক্ষেত্রে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় এগুলো ভেঙে বা উপড়ে যাবার ভয় থাকে। তাছাড়া, টবের গাছ বড় হয়ে যে পরিমাণ শিকড় ছাড়ে তাতে টবের ভিতরে পানি দিয়ে তেমন কোনো লাভ হয় না। টবের গায়ে ঘন শিকড়ের চাপে এসব পানি নিচে যেতে পারে না। এসময় টবের ফুটো দিয়ে প্রসারিত শিকড়গুলোই ঘাসের বেড থেকে পানি শুষে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে নেয়।
বাগানের বাড়তি সৌন্দর্য সাধনের জন্য ‘সিজন’ বা ঋতু হিসাব করে, ঘাসের বেডে হাইব্রিড ডালিয়া, গাঁদা ইত্যাদি ফুলের চাষ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চাইলে কিছু শাকসবজিও লাগাতে পারেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে এভাবেই ছাদ-বাগান করা হয়।
এ ধরনের বাগানে তেমন বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে না। ঘাসের বেডে সময়-সময় পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা এবং ঘাস ও বড় গাছগুলো ছেঁটে সুন্দর করে রাখাই প্রধান কাজ। ফুলের গাছ লাগানোর সময় বেড থেকে পুরোনো কিছু মাটি ফেলে দিয়ে, সেখানে নতুন মাটিতে গোবর সার ইত্যাদি মিশিয়ে চারা লাগানো ভালো। অতিবৃষ্টির সময়, বেড ঘেরা ইটের দু’দশখানা ইট (ওপর দিক) এমন করে ভেঙে দিতে হবে যাতে সেখান থেকে বেডে জমে থাকা বাড়তি পানি গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। শুকনো মৌসুমে এসব ভাঙা ইট মেরামত করে নিতে হবে।
বাগান বানানোর পদ্ধতিগত দিকগুলো আলোচনা শেষ করে এবার ছাদ-বাগানের উপকারিতা নিয়ে একটু আলোচনা করি। আমার মনে হয়, এ বাগানের প্রধান উপকারিতা গ্রীষ্মকালে ছাদের নিচের ঘরগুলোকে ঠান্ডা রাখা। ছাদের নিচে বসবাসরত মানুষগুলোর জন্য গ্রীষ্মকালের ‘বাড়তি গরম’ একটি বিরক্তিকর বিষয়। ছাদ-বাগানের দ্বিতীয় উপকার, পড়ন্ত বিকেল অথবা চাঁদনি রাতে গাছগাছালির ভেতরে সুন্দর ঘাসের উপর চেয়ার ফেলে বসে থাকা কী হেঁটে বেড়ানো। এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে একটি নির্মল আনন্দের ব্যাপার। এছাড়াও বাড়তি পাওনা হিসেবে বাড়ির ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলো খুব সহজেই নিজেদের ছাদে বসে করা যায়। এসব অনুষ্ঠানের সময়, বাগানের দু’দশটি গাছে ‘মরিচবাতি’ লাগিয়ে নিলে সুন্দর আবহ তৈরি হবে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা থেকে এভাবে অনুষ্ঠান করা বেশ সাশ্রয়ী। অ্যাপার্টমেন্ট দালানের জন্যও ছাদ-বাগানের উপকারিতা সমানভাবে প্রযোজ্য। ছাদের কিছু জায়গায় লতাগুল্মের দেয়াল তুলে, আড়ালে রান্নাবান্না, কাপড় শুকানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
পরিশেষে, ছাদে কোনো ধরনের বাগান না করা হলেও, যেকোনো দালানের শেষ ছাদে কোনো রকম সূক্ষ্ম ছিদ্র থেকে পানি চুইয়ে ছাদের নিচে ড্যাম হচ্ছে কিনা দেখে নেয়া খুব জরুরি। নইলে ভবিষ্যতে পুরো ছাদটাই খারাপ হয়ে যেতে পারে।
n লেখক: ক্যাপ্টেন, মাস্টার মেরিনার
