ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে প্রায়ই চোখে পড়বে আকাশে ড্রোন ওড়াতে ব্যস্ত একদল শিক্ষার্থীকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রনিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের এই শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ সময় কাটে গবেষণাগারে। দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যখন স্বপ্ন দেখছে পুথিগত বিদ্যা অর্জন করে বিসিএস ক্যাডার কিংবা ভালো চাকরিজীবী হওয়ার তখন এই শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখছে প্রযুক্তিক্ষেত্রে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরির, যেই বাংলাদেশ ড্রোন আমদানি নয় রপ্তানি করবে, যেই বাংলাদেশ সোফিয়ার মতো রোবটকে আমন্ত্রণ জানাবে না বরং সোফিয়ার থেকেও উন্নত রোবট তৈরি করবে। আর এই স্বপ্ন নিয়েই ইইই বিভাগের এই শিক্ষার্থীরা গঠন করে ‘রোবো গ্যাং’ টিম। চারজন শিক্ষার্থীর এই ছোট দলটি মাত্র দু’বছরেই বেশ কয়েকটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভ করেছে, সর্বশেষ তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত ‘রোবো কার্নিভাল-২০১৯’। এ প্রতিযোগিতায় দেশের প্রায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। রোবোট নিয়ে স্বপ্ন দেখা চার সদস্যের এই ‘রোবো গ্যাং’ টিমের প্রধান উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান এবং অপর তিনজন সদস্য হলেন:ওহিদুর রহমান বাপ্পী, হাবিবুল্লাহ নিয়ন এবং তানভীর আহমেদ রিমন।
এই চার মেধাবী তরুণের একসঙ্গে কাজ শুরুর গল্পটা একটু অন্যরকম। মেহেদী হাসানের বাবার স্বপ্ন ছিলো ছেলে হবে একজন ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞ, এই উদ্দেশ্যে ছেলেকে পড়িয়েছিলেন মাদ্রাসায়। কিন্তু ছেলের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞানের প্রতি, তাই মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর স্বপ্ন দেখছিলেন ইলেকট্রনিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার। তবে স্বপ্নের পথে প্রথমেই বাধা দিলেন বাবা, কিন্তু মেহেদী তার অবস্থানে ছিলেন অনড়। একটা সময়ে তাই বাবাও হার মানেন ছেলের স্বপ্নের কাছে। তবে বাবা ছেলের মান-অভিমানে প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেননি মেহেদী। দ্বিতীয়বার ভর্তির সুযোগ পান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে তিনি বেছে নেন বশেমুরবিপ্রবিকে। ওয়াহিদুর রহমান বাপ্পীর স্বপ্ন ছিলো কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর শিক্ষার্থী হওয়ার আর হাবিবুল্লাহ নিয়ন এবং তানভীর আহমেদ রিমনের স্বপ্ন ছিলো বুয়েটের ইলেক্ট্রনিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগ। কিন্তু ভাগ্য তাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলো অন্য কিছু। ভাগ্যক্রমে এই চার শিক্ষার্থী হয়ে যান সহপাঠী, স্বপ্ন আলাদা থাকলেও চারজনের মধ্যেই ছিলো গবেষণার ইচ্ছে, আবিষ্কারের নেশা, স্বপ্ন ছিলো প্রযুক্তি দিয়ে বিশ্বজয়ের আর সেই স্বপ্ন থেকেই তারা ২০১৭ সালে তৈরি করেন ‘রোবো গ্যাং’, আর ২০১৮ সালে গঠন করেন ‘বশেমুরবিপ্রবি রোবোটিকস অ্যান্ড রিসার্চ ক্লাব’।
চেষ্টা এবং মেধার সাহায্যে যাত্রা শুরুর মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত জাতীয় সাইন্স ফেস্ট-২০১৭-তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ‘রোবো গ্যাং’ শুরু করে তার সাফল্যের যাত্রা, পরবর্তীকালে এই দলটি দ্বিতীয় রানার্স-আপ হয় ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এসোনেন্স-২০১৭’-তে, সাফল্যমণ্ডিত ২০১৭ কাটানোর পর ২০১৮-তে প্রথমবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয় রোবো গ্যাং, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সময় অবতরণের স্থান নির্ধারণে ভুল হওয়ায় বিধ্বস্ত হয় তাদের ড্রোনটি, তবে ব্যর্থতা তাদের থামাতে পারেনি, নিরলস পরিশ্রমে তারা তাদের ড্রোনটিন পুনঃনির্মাণ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করেন। আর এই পুনঃনির্মিত ড্রোনটি নিয়েই তারা চ্যাম্পিয়ন হন রোবো কার্নিভালে। তাদের আবিষ্কৃত এ ড্রোনটির সাহায্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বন্যাকবলিত বা দুর্গত পাহাড়ি এলাকায় ওষুধ ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ, নির্দিষ্ট এলাকা টহল দেয়াসহ ভালো রেজুলেশনের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ ও সরাসরি সম্প্রচার করা সম্ভব। এমনকি এই ড্রোনটি গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলা রোধে ট্রাকিংয়ের কাজও করতে সক্ষম।
তাই এই শিক্ষার্থীরা আশা করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিগগিরই তাদের এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে এবং তারা তাদের গবেষণাকার্যের মাধ্যমে শুধুমাত্র জাতীয় নয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করবে। পাশাপাশি তারা আশা করেন সকল ধরনের গবেষণাকার্যে সরকারি সহযোগিতা এবং দেশের মেধাশক্তির সঠিক ব্যবহারের। দেশিয় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বের কাছে একসময় হয়ে উঠবে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এমনটাই প্রত্যাশা এই তরুণদের।
n লেখক: শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
