১০ বছরে ৯ সরকার তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের সেই গণতন্ত্র কোথায়?

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ২১:৪৭

শিফারুল শেখ

 

দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন এবং ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বহীন। কিন্তু তার পরও উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া নামের দেশটি বিশ্বে অতি পরিচিত। কারণ ২০১০ সালে এখান থেকেই শুরু হয়েছিল আরব বসন্ত যা একনায়কদের বিরুদ্ধে মানুষের জাগ্রত হওয়ার এক কঠিন লড়াই। অন্য দেশেও এই বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল। কয়েকটি দেশে একনায়কদের পতন হয়েছিল। কিন্তু সেই আরব বসন্ত কী তিউনিসদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছে? এই প্রশ্ন এখন অনেকের মনে। বিপ্লবের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা কেউই গণতন্ত্র তো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করেনইনি, অর্থনীতিকেও চাঙা করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে পারেননি, বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন। ১০ বছরে অনেকে এসেছেন এবং গেছেন।

 

নোবেল আসলেও জীবনে উন্নতি আসেনি

২০১৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল তিউনিসিয়ার চারটি সংগঠনকে যারা দেশটিকে গণতন্ত্রের উত্তরণে সহায়তা করে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বলেছিলেন, তিউনিসিয়ায় ২০১১ সালের বিপ্লবের পর সেখানে বহু মতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এই চারটি সংগঠন ‘তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন, তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড অ্যান্ড হ্যান্ডিক্র্যাফটস, তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লীগ এবং তিউনিসিয়ান অর্ডার অব লইয়ার্স’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৩ সালে তিউনিসিয়ায় একের পর এক গুপ্ত হত্যা এবং ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষের মুখে গণতন্ত্র যখন প্রায় ভেস্তে যাচ্ছিল এবং গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল তখন এই চারটি সংগঠন জোটবদ্ধ হয়, শান্তিপূর্ণ পথে এক বিকল্প রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা করে। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে তিউনিসিয়ায় একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয় যেখানে সবার জন্য মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। নোবেল কমিটি আশা করেছিল, এই পুরস্কার তিউনিসিয়ার গণতন্ত্রকে আরো সংহত করতে অবদান রাখবে। তবে পুরস্কারে সুশীল সমাজ দেশটিতে শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে। তারা বিক্ষোভের মোড়ও ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন এমন ধারণা করা হয়। কিন্তু গণতন্ত্র সুসংহত হয়নি। বরং আরেক স্বৈরাচারের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন তিউনিসরা।

 

সেই ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যক্তিই স্বৈরাচারের ভূমিকায়

প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ। ২০১৯ সালে নির্বাচনি প্রচারণার আগ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি সাংবিধানিক আইন বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। রাজনীতিকদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিল। টেলিভিশনে রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। দেশের গণতন্ত্র এবং দেশের উন্নতির জন্য ভালো ভালো কথা বলতেন। রাজনীতিকদের সমালোচনা করতেন। এর মাধ্যমে তিনি ভালো জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবেই বেছে নেওয়া হয়। তিনি ইসলামি বড় পার্টি এন্নাহাদার (মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক) সমর্থন নিয়েই প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু সেই ব্যক্তিই স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দুই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছেন এবং পার্লামেন্ট ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। স্পিকার সেনাবাহিনীর বাধায় পার্লামেন্টে ঢুকতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট পুলিশ বাহিনীকে বিশ্বাস করেন না। তাই সেনাবাহিনী দিয়ে বিক্ষোভ দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার সঙ্গে আছে দেশটির সেনাবাহিনী যাদের সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার। সেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সংখ্যা প্রায় সমান। বিরোধীরা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে ‘বেসামরিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি নির্বাহী ক্ষমতা নিজের কাছে নিয়েছেন। মিশরের মতোই তিনি অভ্যুত্থান ঘটালেন।

সেখানে কাজটি করেছেন সেনাপ্রধান, আর তিউনিসিয়ায় সেনা সমর্থন করলেন প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার টেম্পল ইউনিভার্সিটির সংযুক্ত অধ্যাপক জেরি সেরকিন মনে করেন, গণতন্ত্রই যে সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না তা তিউনিসিয়ার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ক্ষমতায় যাওয়া ব্যক্তি যদি ক্ষমতার লোভী না হন তাহলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়, একনায়কের বিদায়ে মানুষের ভাগ্য ফেরে।

১০ বছরে ৯ সরকার

২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় বিক্ষোভের মাধ্যমে তত্কালীন একনায়ক বেন আলীকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে তিনি সৌদি আরবে মারা যান এবং নীরবেই তাকে সেখানে দাফন করা হয়। গত ১০ বছরে ৯টি সরকার গঠিত হয়েছে। সে কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসেবার মান বাড়ানোর কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

২০১৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা বিবাদে জড়িয়েছেন। তাদের দ্বন্দ্বের কারণে মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগ, করোনা মোকাবিলা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান ইত্যাদি কাজ ব্যাহত হয়েছে। সম্প্রতি করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণের হার বেড়েছে। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে সরকারি হিসেবেই করোনায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা তো আগের চেয়ে আরো খারাপ হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সুর নরম কেন

মিশরের মতো তিউনিসিয়ায়ও মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায়। তবে মিশরের অবস্থা দেখে বড় ইসলামিক দল এন্নাহাদা ধর্মনিরপেক্ষ ভূমিকায় আছে। মসজিদ থেকে কট্টরপন্থি কিছু প্রচার করা হলে মসজিদও বন্ধ করে দিয়েছে এন্নাহাদা। মিশরে নিষিদ্ধ হলেও ব্রাদারহুড তাই তিউনিসিয়ার ক্ষমতায়। বেন আলির ক্ষমতাচ্যুতির পর ব্রিটেনে নির্বাসনে থাকা এন্নাহাদার প্রধান রাশিদ ঘানুচি দেশে ফেরেন। মিশর, সৌদি ও আমিরাত জোট প্রেসিডেন্ট সাইদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিচ্ছে। কারণ তারা মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে। এমনকি এসব দেশের সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সাইদের পক্ষে প্রচার চলছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বও গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করার বিরুদ্ধে খুব একটা উচ্চবাচ্য করছে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন প্রেসিডেন্ট সাইদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর আহ্বান জানিয়েই চুপ আছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক চার্লস ডিউনও এ নিয়ে বিস্মিত।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক নোয়াহ ফেল্ডম্যানও মনে করেন, বাইডেন প্রশাসন আরো কিছু করতে পারে। কিন্তু করছে না। কারণ, সাইদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন তিউনিসিয়াকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে পরিবহন, বাণিজ্য ও পানি খাতকে শক্তিশালী করতে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে তিন বছরে ৪০০ কোটি ডলার ঋণসহায়তা চেয়েছে সাইদের সরকার। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার সঙ্গে ১০ বছরের সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীর    পেছনে ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে।