মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের ছয় মাস রাজনৈতিক, মানবিক সংকট বাড়ছেই

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ২১:৪৭

তালেব রানা

 

চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতাসীন অং সান সু চির এনএলডি পার্টিকে সরিয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে সামরিক জান্তা সরকার। গতকাল রবিবার সামরিক সরকারের ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এই ছয় মাস ধরে সামরিক সরকারকে তীব্র জনরোষ ও প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে। গণতন্ত্রের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে লাখ লাখ মানুষ। কিন্তু বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়ন করে এখনো ক্ষমতা রয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এসব বিক্ষোভে সেনাবাহিনীর গুলিতে মৃত্যু হয়েছে ৯০০-এর বেশি মানুষের। গ্রেফতার করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। ছয় মাস পূর্তির প্রক্কালে গত শনিবারও মিয়ানমারের অন্যতম বৃহত্ শহর মান্দালয়ে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়।

এই ছয় মাসে সামরিক শাসকেরা বিক্ষোভ দমনের নামে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির দাবি— অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ দমন ও বিরোধীদের গ্রেফতারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে ধরনের সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে এবং নির্যাতন, খুনসহ যে ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে তা মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোর লংঘন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, মিয়ানমারের জনগণের ওপর এসব হামলা মানবতাবিরোধী অপরাধ, যারা এর জন্য দায়ী তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।

সামরিক জান্তা সরকার ক্ষমতা দখলের পর এক বছরের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখনো তার কোনো আভাস মিলছে না। বরং মিয়ানমারের জনপ্রিয় নেত্রী সু চি-সহ তার দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গৃহবন্দি ও কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে। একের পর এক তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে সামরিক সরকার। যদিও গতকাল রবিবার এক ভাষণে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লেইং নিরপেক্ষ নির্বাচন করার আবারও অঙ্গীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন।

কিন্তু এই ছয় মাসে দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট কাটেনি। মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জাতিসংঘ এক বিবৃতিতে বলেছে, অভ্যুত্থানের ছয় মাস পরও দেশটিতে রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট বেড়েই চলেছে। মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারে অস্থিতিশীলতা বাড়ছেই। আর্থ-সামাজিক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। শান, কাচিন ও চিন প্রদেশে বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর লড়াই অব্যাহত রয়েছে। এসব লড়াইয়ের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে করোনার তৃতীয় ঢেউ বাড়তে শুরু করেছে।

আলজাজিরার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানীতে কোভিড-আক্রান্তদের পরিবার স্বজনেরা অক্সিজেন ও চিকিত্সার জন্য হাহাকার করছেন। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। দেশটির ক্ষমতা দখল করা সামরিক জান্তা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সঙ্গে জান্তা বিরোধী যে ছায়া সরকার গঠিত হয়েছে তাদেরও কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপও রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন করতে পারছে না। দিনে দিনে পরিস্থিতির শুধু অবনতিই হচ্ছে।

সামরিক সরকার জনবিক্ষোভের মুখে দেশটিতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় থাকতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। করোনা মহামারির এই সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে কতটা চাপে ফেলতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যে কারণে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তা সহসাই কাটছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।