আদালতের রায় হলেই জামায়াত নিষিদ্ধ হবে

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:৩৩

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, জামায়াত যুদ্ধাপরাধী দল, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর ছিল। এ দেশে গণহত্যা চালানো থেকে শুরু করে ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের অপরাধ করেছিল। জামায়াত নিষিদ্ধের মামলাটি আদালতে চলমান রয়েছে। আমি আশা করি, কোর্টের রায় খুব শিগগিরই যদি হয়ে যায়, তাহলে জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হবে। জনগণকে ধন্যবাদ জানাই তারা জামায়াতকে ভোট দেয়নি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের অপরাধের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে তাদের বিচার বন্ধ করে  দেয়, তাদের ভোটের অধিকার দেয়, রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করে তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। তারেক রহমানসহ দণ্ডিত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকরের দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা।

জাতীয় পার্টির (জাপা) ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু নির্মাণে দেরির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, কারিগরি দিক থেকে অত্যন্ত জটিল এ সেতুর পাইল ড্রাইভিং চলাকালে সয়েল কন্ডিশনের কারণে কিছু পাইলের পুনরায় ডিজাইন করতে হয়েছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এ সকল পাইলিং ডিজাইনের কাজ সম্পন্ন করতে কিছু সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। এ সত্ত্বেও ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৬২ শতাংশ ভৌত কাজ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। রেল সংযোগ স্থাপন এবং পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা হতে বরিশাল পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের কাজও চলছে। রেলপথ না থাকা বরিশাল জেলাকেও রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্যে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশদ নকশা প্রণয়নসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩৯ শতাংশ। এছাড়া গত ২৭ এপ্রিল চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর প্রকল্পের মূল কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছি। সবশেষ ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এদেশের আপামর জনসাধারণ বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। এ বিজয় ছিল খুবই প্রত্যাশিত। নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে এরকম পূর্বাভাসই দেওয়া হয়েছিল।

আনোয়ারুল আজিমের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা, অনুদান ও কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যুব সমাজকে করে তোলা হচ্ছে শিক্ষিত, দক্ষ, কর্মমুখী ও আত্মনির্ভরশীল। তিনি জানান, দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ। এরমধ্যে ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৬-১৭ এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ২৬ লাখ ৭৭ হাজার বেকার রয়েছে, যা মোট শ্রমশক্তির ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি ইকনোমিক জোন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরও এক কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

ফখরুল ইমামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার শিগগিরই রাখাইন রাজ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে যথাসম্ভব দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা করেন।

৬টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র ও ৯টি গ্রিড উপকেন্দ্র উদ্বোধন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা উন্নীত হয়েছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রত্যেকটি গ্রাম শহর হবে। বর্তমানে দেশের ৯৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুত্ পাচ্ছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুত্ পাবে। গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৬টি বিদ্যুেকন্দ্র এবং ৯টি গ্রিড উপকেন্দ্র উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। উল্লিখিত বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলোতে উত্পাদিত ১ হাজার ৬২ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্দ্ব্বীপ উপজেলায় দেশে এই প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুত্ সরবরাহ এবং ১২টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুত্ সংযোগের উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনকৃত ৬টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র হচ্ছে-সিরাজগঞ্জ ২৮২ মেগাওয়াট সিম্পেল সাইকেল বিদ্যুেকন্দ্র, ভোলা ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুেকন্দ্র, চাঁদপুর ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র, আশুগঞ্জ ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র, খুলনার রূপসায় ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র এবং চট্টগ্রামের জুলদা ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র (তৃতীয় ইউনিট)। নয়টি উপকেন্দ্র হচ্ছে-রামগঞ্জ, বরিশাল (উত্তর), বারইয়ারহাট, শিকলবাহা, জলঢাকা, সুনামগঞ্জ, বিয়ানিবাজার, রাঙ্গামাটি ও মাতারবাড়ি। শতভাগ বিদ্যুত্ সংযোগের আওতায় আসা উপজেলাগুলো হচ্ছে-হরিনাকুন্ড, ঠাকুরগাঁও সদর, বালিয়াডাঙ্গা, গোয়ালন্দ, কালুখালী, বামনা, লাখাই, শায়েস্তাগঞ্জ, আজমেরীগঞ্জ, বাহুবল, মেলান্দহ এবং ইসলামপুর।

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। বিদ্যুত্ বিভাগের সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস অনুষ্ঠানে বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ এবং ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ, মির্জা আজম, আবদুল্লাহ ইসলাম আল জ্যাকব এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যগণ এ সময় গণভবনে উপস্থিত ছিলেন।

চেক ভাষায় অনূদিত ‘চ্যারিয়ট অব

লাইফ’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল তার বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর চেক ভাষায় অনূদিত ‘চ্যারিয়ট অব লাইফ’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছেন। গণভবনে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি। ‘চ্যারিয়ট অব লাইফ’ বইটি ৩৭ বছর আগে লেখকের যাপিত দুই জীবনের আত্মজীবনীমূলক বই। জাতীয় স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রাপ্ত এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বইটি এবং লেখক সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘চ্যারিয়ট অব লাইফ বইটিতে ঘটনার সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে চিত্তাকর্ষকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেগুলো অনেক পরে ঘটেছিল। এটি সুলিখিত সাহিত্যের চমত্কার অংশ। শেষ অংশ পদ্যাকারে লেখা। এটি একটি কবিতা।’

শেখ হাসিনা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নেতা: অ্যাঞ্জেলিনা জোলি

বাসস জানায়, ইউএনএইচসিআর-এর বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, শেখ হাসিনা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নেতা। গতকাল সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কালে এ মন্তব্য করেন। সাক্ষাত্ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বলেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ওপর বিশাল বোঝা সৃষ্টি করেছে। আশ্রয় শিবিরগুলোতে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের দেখভাল করা খুবই কঠিন কাজ। এ প্রসঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন যে, জাতিসংঘ, ইউএনসিএইচআর ও বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের বোঝা লাঘবে একযোগ কাজ করবে। এঞ্জেলিনা জোলি বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেন।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের বিশেষ দূতকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট অবশ্যই সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নে বিলম্বে হতাশা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভগ্নিপুত্র রেদোয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব নজিবুর রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।