আলোচিত নায়িকা পরীমনি গত পাঁচ বছর ধরে ‘মাদকাসক্ত’। তিনি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। আর তার এই মাদক সরবরাহের কাজ করতেন প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ। এমন অভিযোগ এনে তাদের দু’জনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে রাজধানীর বনানী থানায় পৃথক দুই মামলা হয়েছে। ঐ দুই মামলায় পরীমনি, নজরুল ইসলাম রাজ, পরীমনির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম ও রাজের সহযোগী সবুজকে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে তাদের প্রত্যেককে চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
রাত ৮টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে পরীমনিকে আদালতে নেওয়া হয়। মহানগর হাকিম মামুনুর রশীদের আদালতে রিমান্ডের শুনানির আগে পরীমনির পক্ষ দাবি করে ১০/১২ জন আইনজীবীর মধ্যে বাগিবতণ্ডা হয়। এ সময় আদালত জানতে চায়, ‘কে আসামির আইনজীবী? বিষয়টি নিষ্পত্তি করার পর রিমান্ডের শুনানি হবে।’ এরপর বিচারক এজলাস ছেড়ে উঠে যান। পরবর্তী সময় পরীমনির আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত হন নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী। মহানগর হাকিম মামুনুর রশীদের আদালতে রিমান্ডের শুনানি শুরু করেন। আদালত প্রথমে পরীমনি ও তার সহযোগী আশরাফুলের মামলায় শুনানি নেন। দুজনেরই চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন তিনি। পরে একই আদালতে নজরুল ইসলাম রাজ ও তার সহযোগী সবুজের রিমান্ড শুনানি হয়। তাদের দুজনেরও চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খোন্দকার আল মঈন গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রচলিত আইনের বিধিবিধান মেনেই নায়িকা পরীমনির বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানের সময় র্যাবের নারী সদস্যরা ছিলেন। এক জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাই এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘৩ আগস্ট র্যাবের গোয়েন্দা দল জানতে পারে, মিশু হাসান ও জিসান একটি চক্র গড়ে তুলেছেন। সেই চক্রের হোতা হচ্ছে পরীমনি, রাজ, পিয়াসাসহ আরো অনেকে। ৪ আগস্ট সকালে মিশু ও জিসানকে বসুন্ধরা এলাকা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, পরীমনি তার বাসায় একটি মিনি বার স্থাপন করেছেন। সেই বারে প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ নিয়মিত মাদক সরবরাহ করে থাকে।’
মঈন আরো বলেন, তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব পরীমনির বাসায় অভিযান চালিয়ে মিনি বারের সন্ধান পায়। সেখান থেকে বিদেশি মদ, ভয়ংকর মাদক এলএসডি ও আইসসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার আরেক সহযোগী চক্রের গডফাদার নজরুল ইসলাম রাজের বাসায় অভিযান চালানো হয়। রাজের বাসা থেকেও মাদক পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার করার বেশ কিছু উপকরণ পাওয়া যায়। এরপর বনানীতে অভিযান চালিয়ে নজরুল ইসলাম রাজকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানায়, বুধবার রাত ও বৃহস্পতিবার সকালে পরীমনি ও রাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা নানারকম চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে পরীমনি জানান, পিরোজপুরের একটি কলেজে ইন্টারমেডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় ঢাকায় আসেন। ২০১৪ সালে রাজের মাধ্যমে প্রথম একটি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন। ২০১৬ সালে অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন। সেই থেকেই তার বাসায় মিনি বারে প্রায়ই পার্টি করা হতো। সেই পার্টিতে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অনেককেই দাওয়াত করে আনা হতো।
রাজ জানান, ১৯৮৯ সালে খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করে ঢাকায় আসেন। এরপর চাকরি-ব্যবসা ও ঠিকাদারিও করেছেন। ব্যবসায়ী শ্রেণির সঙ্গে ওঠাবসা করার কারণে কৌশলে ২০১৪ সালে প্রযোজক হিসেবে নাম লেখান। ২০১৮ সালে রাজ মাল্টিমিডিয়া প্রোডাকশন হাউজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
রাজ আরো জানিয়েছেন, মিশু হাসান ও জিসানকে দিয়ে ১০/১২ জনের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। এই সিন্ডিকেটের বাইরেও প্রায় শতাধিক নারী ও মডেল রয়েছে। যাদের বিভিন্ন কাস্টমারের কাছে সরবরাহ করত এই সিন্ডিকেট। সুযোগ বুঝে তারা ব্ল্যাকমেইল করত। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ টাকার মালিক হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘পার্টিতে কারা অংশ নিত, কাদের যাতায়াত ছিল তাদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আসামিরা ঐসব তথ্য দিয়েছেন, কোনো তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না তা যাচাই করা হচ্ছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারা জড়িত থাকবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এদিকে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আজম মিয়া জানান, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে র্যাব সদর দপ্তর থেকে কালো একটি মাইক্রোবাসে পরীমনিসহ আসামিদের বনানী থানায় আনা হয়। পরে তাদের বনানী থানায় হস্তান্তর করে র্যাব। এরপর র্যাব বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে। মামলা দুটির তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানা।
প্রসঙ্গত, ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা পরীমনি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন। কিছুদিন আগে ঢাকার আশুলিয়ার বোটক্লাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অভিযোগ করে আলোচনায় আসেন তিনি। ঐ ঘটনায় কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছিলেন, তারা আবার জামিনও পেয়েছেন। এর মধ্যেই আবার একাধিক ক্লাবে পরীমনির বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
