আসহাবে কাহাফ
বর্ষাকাল এলেই চট্টগ্রাম জেলাসহ অন্য পার্বত্য অঞ্চলসমূহে ভূমিধস তথা পাহাড় ধসের মতো দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। প্রসঙ্গত, ভারতীয় একটা চলচ্চিত্রের কথা বলতে হয়। ২০১৫ সালের আগস্টে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মাঝি—দ্য মাউন্টেন ম্যান’ মুক্তি পায়। এতে চিত্রায়িত হয়েছে ভারতের বিহারের গয়া নিকটবর্তী গেহলৌরের গরিব শ্রমিক দশরথ মাঝির জীবনী। যিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে একক প্রচেষ্টায় ছেনি দিয়ে কেটে একটি পাহাড়ি ঢিবির মাঝ দিয়ে ১১০ মিটার দীর্ঘ, ৯.১ মিটার প্রস্থ ও ৭.৬ মিটার গভীরতা সম্পন্ন পথ নির্মাণ করেন। মাঝির বানানো এই সড়ক ভারতের আতরি ও ওয়াজিগঞ্জের দূরত্ব ৫৫ থেকে কমিয়ে মাত্র ১৫ কিলোমিটারে পরিণত করে। এই মহত্ কাজের জন্য পাহাড় কাটার ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নেই।
মূল বিষয়ে ফিরে আসি। পাহাড় ধস বাংলাদেশে এখন রীতিমতো ভীতির কারণ। কথা হচ্ছে, পাহাড় ধস কেন ঘটে এবং এর থেকে বাঁচার উপায় কী?
২০১৮ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে গঠিত সাব-কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পাহাড় ধসের কারণ—১. অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত ও মৃদু ভূমিকম্প, ২. মাটিখেকোদের পাহাড় কাটা, ৩. পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ইটের ভাটা, ৪. পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপন ও অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, ৫. দুর্বল মাটির গঠন ও শক্তিশালী ভূমিকম্প। সাব-কমিটির মতে, প্রতিকারের উপায়—১. পাহাড়ে বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষদের জন্য সমতলে স্থায়ী আবাসন নির্মাণের জায়গা নির্ধারণ, ২. রাঙামাটি জেলায় আশ্রয়হীন এবং যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে, তাদের জন্য ছোট ছোট টিলা সমতল করে সেখানে তাদের বসবাসের জন্য সরকারি অর্থায়নে স্থায়ীভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, ৩. পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণ বন্ধ, ৪. পাহাড়ে অধিক পরিমাণে পরিবেশবান্ধব এবং পাহাড় রক্ষাকারী বৃক্ষ ও বাঁশ রোপণ, ৫. রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশের পাহাড়গুলোতে যে কোনো ধরনের স্থাপনা তৈরির অনুমতি সম্পূর্ণভাবে রহিত এবং বর্তমান স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে নিরাপদ ও দূরবর্তী জায়গায় স্থানান্তর, ৬. ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ, ৭. পাহাড় থেকে মাটি কেটে ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—এসবের বাস্তবায়ন কতদূর? কথায় আছে, আশায় বাঁচে মানুষ! ২০১০ সালের ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫’ সংশোধন করে ৬(খ) ধারায় পাহাড় কাটায় বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শাস্তি—ধারাদণ্ড ১৫(১) অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এছাড়াও ২০১২ সালের ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে’র ২(১১) ধারায় ভূমি বা পাহাড় ধসকে ‘দুর্যোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ২(১৩)(ই) ধারায় যে কোনো দুর্যোগ বিষয়ে আগাম সতর্কতা, হুঁশিয়ারি, বিপদ বা মহাবিপদ সংকেত প্রদান ও প্রচারের বাধ্যবাধকতা সংযোজিত করা হয়েছে।
পরিশেষে, সেই দশরথ মাঝির গল্প দিয়ে শেষ করব। দশরথ মাঝি তার এই মহত্ কাজের জন্য প্রশংসিত হয়েছে। ভারত সরকার তাকে সম্মানিত করেছে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রকৃতির শত্রু, মাটিখেকো, ভূমিদস্য যারা প্রতি বছর অগণিত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কাছে আমাদের প্রশ্ন, তাদের বিরুদ্ধে এত এত আইন থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছি না কেন? তবে, নির্বিচারে পাহাড় কাটাও কি দশরথ মাঝির পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর মহত্ কাজ?
চট্টগ্রাম
