॥ তেরো ॥
দুখুর মনিব গার্ড সাহেব, মিস্টার বোস
রেলের ডিউটি শেষ হওয়ামাত্র দুখুর নতুন বস গার্ড সাহেব মানে মিস্টার বোস রেলের পাশে একটি বাংলোতে ছুটে আসেন রোজ। রেলের ফিরিঙ্গি কর্মচারীদের জন্য কয়েকটি বাংলোর মধ্যে এটির প্রতি বোসের টানের প্রধান কারণ এখানে থাকেন এক সজ্জন আধবুড়ো সাহেব, পল আর তাঁর তৃতীয়পক্ষের স্ত্রী নোরা। নোরার প্রথমপক্ষের একটি মেয়েও থাকে বাড়িতে। বর্তমানে মেয়েটির বয়স সতেরো। সে বিকলাঙ্গ, কিন্তু সুন্দরী; যখন বসে থাকে কিছুই বুঝা যায় না। উঠে দাঁড়ালে দেখা যায় তার কোমরটি বাঁকা, পা দুটি ঠিক জায়গায় পড়ে না, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। ওর নাম লোলা।
দুখুর বস, গার্ড সাহেব প্রতিদিনের মতো আজও ছুটে এসেছেন। আর চামড়ার ব্যাগটি নিয়ে সঙ্গে এসেছে দুখুও। ঘরে পল ও নোরা দুজনই অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
দুখু দেখল টেবিলে সাজানো রয়েছে আলুভাজা, সঙ্গে ডিম মামলেট, পরোটা। রান্না করা মাংসের ডিশও আছে আজ।
টেবিলে বসে গার্ড সাহেব দুখুর হাত থেকে চামড়ার ব্যাগটি টেনে নিয়ে ভেতর থেকে বের করলেন বিলেতি মদের বোতল। পেগের পর পেগ চালিয়ে যেতে শুরু করলেন তিনি। নোরা দু-এক পেগের বেশি খেলেন না। পলও না। একসময় নোরা বললেন, ‘মিস্টার বোস, সংযত হোন। আর টানবেন না।’
ওদের নিষেধকে পাত্তা দিলেন না গার্ড সাহেব। টানতে টানতে প্রায় আধা বেহুঁশ হয়ে টেবিলের উপর মাথা রাখলেন তিনি।
ব্যাগটি দিয়ে দুখু বাইরে চলে এলেও দূরে সরে গেল না। কাছাকাছিই পলের ছোটো বাংলোটিতে ওঠার সিঁড়ির একটা ধাপে বসে রইল শীতে কুঁজো হয়ে। আজ খুব ঠান্ডা পড়েছে। শীত সামাল দেওয়ার উপযুক্ত কাপড়চোপড় বা চাদর নেই দুখুর―বিষয়টি দেখে ফেলল লোলা। পাশেই লোলার ঘর।
লোলা ডাকল, ‘বাইরে বসে থেকো না, ভেতরে এসে বসো, দুখু।’
ভেতরে যাবে এমন সময় দুখু শুনল নোরা আর পলের উদ্বিগ্ন কথার অংশবিশেষ। নোরা বলছে, ‘এখন কী হবে। মিস্টার বোস তো প্রায় বেহুঁশ হয়ে গেছেন!’
পল বলল, ‘চলো, ওকে বিছানায় শুইয়ে দিই।’
গার্ড সাহেবের বিশাল দেহটা টানতে গিয়ে দুজনই ধপাস করে পড়ে গেলেন নিচে। দুম করে পতনের শব্দ শুনে দুখু ছুটে গেল ভেতরে। এবার তিনজনে ধরাধরি করে গার্ড সাহেবের আলুথালু বিশাল শরীরটা টেনে বিছানায় শোয়াতে পারলেন। পুরো বেহুঁশ হননি মিস্টার বোস।
নোরা তাঁর চুল টেনে ঝাঁকি দিলেন।
হুঁশ ফিরে পেয়ে চোখ বোজা অবস্থায় গার্ড সাহেব ডাকলেন, ‘দুখু, দুখু!’
পাশে দাঁড়িয়ে দুখু জবাব দিলো, ‘জি, আমি আছি পাশে।’
‘আরেক বোতল দেবে? আরেকটু টানতে ইচ্ছে করছে।’
নোরা এবার ধমক দিয়ে বললেন, ‘আর কত টানবেন, মিস্টার বোস? মাতাল হলে কি আর মদের আনন্দ পাওয়া যায়? ধ্বংস ছাড়া আর কিছু কি আছে এই মাতলামিতে?’
নোরার ধমক খেয়ে অপরাধ করা ছোট্ট শিশুর মতো হয়ে গেলেন মিস্টার বোস। দুখুকে কাছে টানার চেষ্টা করলেন হাত বাড়িয়ে।
পল বললেন, ‘বাইরে যাও, দুখু। ওকে আর মদ দেওয়া যাবে না।’
গার্ড সাহেব বললেন, ‘না। যেয়ো না তুমি।’
সাহেব তার মনিব। মনিবের কথা দুখু অমান্য করেনি কখনো। এখনো মানতে বাধ্য সে। দাঁড়িয়ে রইল।
দুখুকে উদ্দেশ করে সাহেব এবার প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি তো রোজ আমার সঙ্গে থাকো, বলো তো আমি কি মাতাল হই?’
‘না। আমি কেবল একদিন অন্তর আসানসোল যাই আর সেখান থেকে বিলতি মদ কিনে আনি আপনার জন্য।’
‘শুনলে পল, শুনলে নোরা, দুখুই সাক্ষী। আমি মদ পান করি, মাতাল হই না। দাও। আরেক পেগ দাও।’
বাইরে ফিরে যাচ্ছিল দুখু। সাহেবের শেষ কথায় যেন বোমা ফাটল তার মাথায়। অবনত, বাধ্য, অনুগত দুখুর ভেতর থেকে ঝটিতি জেগে উঠল আরেক দুখু। দুখু খেয়াল করল এই অপরিচিত অচেনা দুখু তার নিয়ন্ত্রণে নেই। অন্যরকম তেজস্বী এই নতুন দুখু দৃপ্তপায়ে ফিরে গেল ঘরে, চামড়ার ব্যাগটি হাতে নিয়ে দৃঢ়স্বরে সম্মানের সঙ্গে বলল, ‘হয়েছে। আর পান করা চলবে না। এই যে ব্যাগ নিয়ে বাইরে চললাম আমি। উঠুন, প্রাসাদপুরের বাড়িতে যেতে হবে আপনাকে এখন।’
ঝাড়ি খেয়ে আধা বেহুঁশ অবস্থাতেও হকচকিয়ে গেলেন মিস্টার বোস। তাঁর ভেতর থেকেও জেগে উঠল কর্তৃত্ববাদী সত্তা। টেনে টেনে বললেন, ‘আমি তোমার বস। মনিব। আমার কথা শুনতে বাধ্য তুমি।’
‘আপনার দেখভাল করাও আমার দায়িত্ব। যেন কোনো ক্ষতি না হয় আপনার, সেটাও আমি দেখব। আপনার এখনকার দাবি ক্ষতিই করবে আপনার। সেটা হতে দিতে পারি না আমি।’
‘তুমি চাকরির শর্ত ভঙ্গ করছ, দুখু।’
‘আপনার ভালোর জন্য শর্তের ভেতর থেকে অণুশর্ত খুঁজে পেয়েছি আমি―এই অণু কর্মচারী। সেই শর্তই পালন করছি। এখন আমি যা বলব, বলব আপনার কল্যাণের জন্যই। এটাই সব শর্তের বড়ো শর্ত। উঠুন। প্রাসাদপুরের বাড়িতে যেতে হবে। সেখানে মেমসাহেব রোজ অপেক্ষা করেন আপনার জন্য।’
পল আর নোরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। দুখুর ভেতর আরেক দুখুকে আবিষ্কার করে তার মাথায় হাত রাখলেন পল। অনুচ্চারিত আশীর্বাদের ছোঁয়া দিয়ে যেন নিজেকেই ধন্য করলেন। নোরা মুখ ফুটে বললেন, ‘ঠিক বলেছ, দুখু। অবশ্যই মিস্টার বোসকে রক্ষা করবে। ক্ষতিকর কোনো কাজে ছাড় দেবে না তাকে।’
ততক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন গার্ড সাহেব। তাঁর কর্তৃত্ববাদী বসগিরি তরল হয়ে গেছে। আগের অবস্থায় ফিরে না এলেও, দুখুর হাত ধরে বললেন, ‘চলো, দুখু। প্রাসাদপুরের বাড়িতে চলো।’
মনিবকে গলে তরল হয়ে যেতে দেখে হঠাৎ জেগে ওঠা দুর্দমনীয় দুখুও উধাও হয়ে গেল। নিজের ভেতরে চট করে ফিরে এলো আবার আগের দুখু; অনুরক্ত, বাধ্য দুখু। কিছুক্ষণ আগে কী ঘটেছে, কে ঘটিয়েছে, কেন ঘটেছে―কিছুই জানে না এই সহজসরল ছেলেটি। গার্ড সাহেবের হাত ধরে সে বলল, ‘চলুন।’
সাহেব নরম স্বরে বললেন, ‘আমি মাতাল হয়েছি, দুখু?’
‘আজ্ঞে না।’
‘শুনলে তো পল, শুনলে তো নোরা, আমি মাতাল হইনি।’ শিশুর মতো কথা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরোলেন তিনি। সিঁড়ির ঘর থেকে লোলাও দেখল সব―টলতে টলতে হাঁটছেন সাহেব। হোঁচট খেয়ে একবার দড়াম করে পড়েও গেলেন। দুখুর সহায়তায় উঠে দাঁড়িয়ে আবার বললেন, ‘হাত ছেড়ে দাও, দুখু। আমি মাতাল হইনি। একাই যেতে পারব প্রাসাদপুর।’
জংশন থেকে প্রাসাদপুর একা যেতে কিংবা আসতে লাগে দুখুর আধাঘণ্টা। মাতাল মনিবকে নিয়ে যেতে লাগল তার প্রায় দুই ঘণ্টা।
এ হলো দুখুর নিত্যদিনের চাকরি।
এই চাকরি কি ভালো লাগে দুখুর? পঁচিশ টাকা হিসাবে মাসশেষে মাইনে পায়। টাকার প্রয়োজনের বলি হয়ে যায় ইচ্ছা। পড়াশোনা চালাতে পারছে না―এ বোধও ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খায়, জানে কি আমাদের গল্পের দুখু? নাকি চলমান কঠিন জীবনের বাঁক থেকে তুলে নিচ্ছে সে অন্যরকম জীবনবোধ, অন্যরকম অভিজ্ঞতায় কি পূর্ণ করছে আগামী দিনের চলার পথ?
চলবে...
