হূদয়টা কখন ক্ষতবিক্ষত হয়। কখন হূদয় রক্তাক্ত হয়। চোখের জল কখন উপচে আসে। সবচেয়ে প্রিয় মানুষের সামনে অঝোরে কান্না আসে কখন। শুধু ফুটবল দুনিয়াটাই নয়, টোকিও অলিম্পিক গেমসের সমাপনী দিনে ফুটবল দুনিয়া থমকে গিয়েছিল লিওনেল মেসির কান্নায়। সাফল্য তুলে এই মেসি কত বারই না চোখের জল ফেলেছিলেন আনন্দে। সেই আনন্দাশ্রু কখনো বিষাদের হতে পারে মেসির জীবনে, তা শুধু জানত নিয়তি। বার্সেলোনা হতে মেসির এমন বিদায় অপ্রত্যাশিত। কথা দিয়ে কথা রাখেনি বার্সেলোনা। কথা ছিল অর্ধেক বেতনে খেলবেন মেসি। বার্সেলোনার আর্থিক অবস্থা ভালো না জেনে মেসি আর্থিক বিষয়টা ভুলে গেছেন। যেভাবে অর্ধেক বেতনে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সেভাবেই খেলতে রাজি ছিলেন। কিন্তু চুক্তির দিনে সব কিছু ওলট-পালট হয়ে গেল।
বার্সেলোনার সভাপতি হুয়ান লাপার্তো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। এক বেতনের কথা বলে আনুষ্ঠানিক চুক্তির সময় আরেক বেতনের কথা উল্লেখ করায় হতাশ হয়েছেন মেসি। অর্ধেক বেতনে রাজি হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন টাকা কোনো ব্যাপার না। কারণ মেসি টাকার জন্য খেলেন না। বার্সায় যখন প্রতিষ্ঠিত তারকা হয়ে গেছেন আর্জেন্টিনার মেসি তখন চাইলেই চুক্তি মেনে বেরিয়ে যেতে পারতেন। সেটা করেননি। বার্সার দেউলিয়াত্বের সময় বেতনের দিক থেকে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় মেসি নিজের বেতন কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন, রাজি হয়েছেন খেলবেন। ৩০ জুন চুক্তি শেষ হলেও কোপা আমেরিকার পরই নতুন চুক্তি করবেন।
মেসি কোপা জিতে বলেননি আমি অর্ধেক পারিশ্রমিকে খেলব না। বাড়াতে হবে। আলোচনা যা হয়েছিল সেটাই হবে। সেই মেসি যখন দেখলেন সভাপতি এক রকম কথা বলে আরেক রকম কাজ করেছেন তখনই বুঝতে পারছেন এখানে বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে। মুখে না বললেও মেসি বুঝতে পারছেন বার্সার সভাপতি হুয়ান লাপার্তো বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। যেখানে বিশ্বাস থাকে না সেখানে মেসি নিজেকেও রাখতে চাইছেন না। সেটা প্রমাণ দিয়েছেন সংবাদ সম্মেলনে এসে। মেসি বলেছেন, ‘আমি ছুটি কাটিয়ে ফিরেছিলাম বার্সায় থাকব বলে। বার্সায় থাকার জন্যই আমি স্পেনে এসেছি। চুক্তির আগের শেষ মিনিটে কি হয়ে গেল? বার্সাকে ছাড়তে কতটা কষ্ট হয়েছে তার বক্তব্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে।
কোথায় যাবেন মেসি ? স্পেনে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা মেসিকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি কোথায় খেলতে যাচ্ছেন। মেসি বলেছেন, ‘কোনো ক্লাবের সঙ্গেই আমার চূড়ান্ত কথা হয়নি। বার্সার সভাপতির ঘোষণার পর আমার কাছে অনেক ফোন এসেছে। বিষয়টা নিয়ে আমরা কথা বলছি। তবে পিএসজিতে খেলার সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে মেসি একটা শব্দ উচ্চারণ করেন, ‘ইয়েস।’
৩৪ বছর বয়সি মেসি বার্সেলোনার অলটাইম টপস্কোরার, বার্সার জার্সি গায়ে ৭৭৮ ম্যাচ খেলে ৬৭২ গোল করেছেন। ছয় বার ব্যালন ডিঅর পেয়েছেন। ক্লাব ট্রফি পেয়েছে ৩৪টি। ১০ বার লা লিগা জিতেছে। চার বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। কোপাদেলরে জিতেছে। এতো সাফল্য এনে দেওয়া সেই মানুষটি তার প্রিয় ঘর ছেড়ে চলে যাবেন, কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
সংবাদ সম্মেলনে মেসি স্ত্রী, তিন সন্তান, তার সঙ্গে খেলা পুয়েল, জাভি, কোচ রোনাল্ড কোম্যান অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবরাও সেখানে হাজির ছিলেন। মেসি যখন সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে উঠেন, তখনই আবেগআপ্লুত হন। চোখের পানি রাখতে পারছিলেন না। কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মেসি। ‘আমি এখনো বার্সাকে আমার হূদয়ে ধারণ করছি। বার্সায় থাকার জন্য আমি সব চেষ্টা করেছি। আমার বেতনও কমিয়ে দিয়েছি। আমি জানি ঋণের বোঝা আছে ক্লাবের। আমি চাইনি আরো ঋণ হোক।’
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এসেছে মেসি পিএসজিতেই খেলবেন। তার সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি হতে যাচ্ছে। দুই বছরের চুক্তির সঙ্গে এক বছর যোগ হবে। ইএসপিএন বলছে, পিএসজিতে মেসির ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত বলা যায় না। চলতি মাসের শেষ দিন পর্যন্ত ইউরোপের দলবদল চলবে।
