রবীন্দ্রনাথের ‘আমার ছেলেবেলা’ বইয়ের শুরুতেই আছে—‘তখন শহরে না ছিল গ্যাস, না ছিল বিজলি বাতি; কেরোসিনের আলো পরে যখন এলো তার তেজ দেখে আমরা অবাক। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঘরে ফরাস এসে জ্বালিয়ে যেত রেড়ির তেলের আলো। আমাদের পড়বার ঘরে জ্বলত দুই সলতের একটা সেজ।’ রেড়ি নিয়ে লিখব ভাবতেই মনে পড়ে গেল ‘আমার ছেলেবেলা’ পড়ার সময় প্রথম শুনি রেড়ির তেলের কথা। শৈশবে রয়নার বীজ দিয়ে ছোট ছোট মাটির গর্তে বীজ ফেলে একটা খেলা খেলতাম। আমি মনে করতাম রেড়ির তেল হলো রয়না থেকে জাত একধরনের তেল। রেড়ির তেলের কোনোরকম ব্যবহার তখন দেখিনি। রেড়ির তেলের সেজ যেন সাহিত্যেই থাকতে পারে, বাস্তবে না। অথচ আমাদের ঘরেই তখন ভ্যারেন্ডার বীজ সরিষার সঙ্গে মিশিয়ে ভাঙাতে দেখেছি অহরহ।

ভেন্নাকেই আমাদের সফিপুরে বলা হতো ভ্যারেন্ডা, বরিশাল জুড়েই হয়তো ভ্যারেন্ডা বলে। জসীম উদদীনের ‘আসমানী’ কবিতায় আসমানীদের দুঃখের সঙ্গে মিলেমিশে আছে ভেন্না পাতার ছানি দেওয়া ঘর। ভেন্নার পাতা সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। অনেকটা পেঁপে পাতার মতো দেখতে, তবে আরো কারুকার্যময়। হঠাত্ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ভেন্নার কয়েকটা পাতা মাথার ওপর ধরেই তো ভো দৌড় দিয়ে উঠে যেতাম ঘরের দাওয়ায়। ভেন্নাগাছ যত্রতত্র বেড়ে উঠতে দেখেছি। এখন সেরকম হয়তো দেখা যায় না। বাড়ির আনাচেকানাচে, পথের ধারে, বনেবাদাড়ে যেমন আপন খেয়ালে জন্মাত ভেন্নাগাছ, আবার গৃহস্থ বাড়ির আশপাশে ভিটা-ঘাটায় বোনা হতো ভেন্না। এত বেশি দেখেছি বলেই কি না ভেন্নাগাছের সঙ্গে ছিল অনেক চেনাজানা। আমাদের এলাকায় শ্বেত ভেন্না এবং রক্ত ভেন্না এই দুধরনের ভেন্নাগাছ চোখে পড়ত। আমার চোখে এখনো ভাসে ঈষত্ লাল রঙের রক্ত ভেন্নাগাছের মিষ্টি লাল কচি পাতার লাজুক হাসি। ভেন্না বা ভ্যারেন্ডাই হিন্দি ভাষায় এরেন্ড বা আরান্ড। ভেন্নার তেল হলো এরেন্ড কা তেল!

এই তো সেদিন জানলাম ভেন্নাই রেড়ি এবং রেড়ির তেলই ইংরেজিতে ক্যাস্টার অয়েল! শহরের বিপণিবিতানে থরে থরে সাজানো থাকে রূপবর্ধনের নানা উপকরণ। তারই মধ্যে অন্যতম ক্যাস্টার অয়েল। চুল এবং ত্বকের স্বাস্থ্যরক্ষায় ক্যাস্টার অয়েল নাকি অব্যর্থ। আমার গাঁয়ের ভ্যারেন্ডার তেলই যে ক্যাস্টার অয়েল সে কথা জানতাম না! তবে ভোজ্য হিসেবে ভেন্নার বীজ বেটে বিভিন্ন ব্যঞ্জন রান্নায় ব্যবহারের কথা জানতাম।

ভেন্না বা রেড়ি গুল্মজাতীয় ছোট গাছ। সাধারণত ১০-১২ ফুট উঁচু হয়। কাণ্ড ও পত্রদণ্ড নরম ও ফাঁপা। পাতাগুলো প্রায় গোলাকার হলেও আঙ্গুলসমেত হাতের মতো দেখতে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই ভেন্না বা রেড়িই আবার ‘কচা’ নামে পরিচিত। কচার লাঠি গ্রামে বহুল চর্চিত অস্ত্র। তবে কচার আসল পরিচয় কৃষক বন্ধু হিসেবে। অনায়াস লব্ধ তৈলবীজ, বীজ ভালো দামে বিক্রি হয়। কচার ডালপালা জ্বালানি হিসেবেও চমত্কার দাহ্য। মূলত কৃষক তার ফসলের মাঠে বেড়াগাছ হিসেবে ভেন্নার বীজ বুনে দেয় আইল ধরে। বেড়া থেকেই ভেন্না শব্দের উত্পত্তি বলে অনুমেয়। ভেন্না নিয়ে অনেক ভ্যারেন্ডা ভাজা হলো। তবে ভেন্নার গোটা বীজের সঙ্গে করোনাভাইরাসের অবয়বগত মিল দেখে প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাজন নানারকম পোস্ট দিয়ে লিখতে দেখি করোনাভাইরাস গাছে ধরে!
ইত্তেফাক/কেকে
