‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি’। গানের এই কলির কথা তোমরা অল্প-বিস্তর শুনেছ। এমন মেলার কথা শৈশবেই বেশ মানায়। মেলায় থাকে হরেক জিনিস। সেখানে তালপাতার বাঁশি থেকে কান বিদীর্ণ করা প্লাস্টিকের ভেঁপুুও রয়েছে। মেলা এখন বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো লেগেই আছে। চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, বৈশাখী মেলা, পৌষ মেলা, চড়ক মেলার মতো আমাদের ঐতিহ্যবাহী মেলা ছাড়াও কৃষিমেলা, বাণিজ্য মেলা, শিল্প মেলা, পুষ্পমেলা, বৃক্ষমেলা—ইত্যাদি মেলায় মেলায় ভরপুর আমাদের নগরজীবন। সে-সব মেলায় কেনা যায় রকমারি দ্রব্য; খাওয়া যায় মুখরোচক খাবার। আনন্দও থাকে সেখানে। দোলনায় দোলা; চরকিতে ঘোরা, সার্কাস এবং পুতুলনাচের মতো আছে বিনোদনও। কিন্তু বিশুদ্ধ আনন্দের একটি মেলার কথাও আমাদের অজানা নয়। জ্ঞানে যে বিমল আনন্দ হয়, সে আনন্দ রয়েছে সেখানে। ছোট ছোট শহরে এ-মেলা দেখা গেলেও ভাষার মাসে মাসব্যাপী মেলা একটাই। আর তা হলো আমাদের সকলের প্রিয় অমর একুশে বইমেলা। জাতীয় গ্রন্থমেলাও বলা হয় একে। মেলাটি হয়ে থাকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে এ মেলার আয়োজন হবার কারণ—শহীদদের স্মৃতির সাথে সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে এ মেলা জড়িয়ে আছে। সে-ইতিহাস ষাটের বেশি বয়স অতিক্রম করেছে। পুরনো সে কথাগুলো সবারই শুনতে ইচ্ছে করে। নিশ্চয়ই তোমাদেরও ইচ্ছে হচ্ছে। তাহলে শোন সে ইতিহাসের কিছু কথা। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটি গড়ে উঠেছিল, শুরুতেই সে নিয়ে এল বঞ্চনা। প্রথমেই আমাদের মায়ের ভাষায় আঘাত হানে। উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করতে চায় তারা; কিন্তু ব্যর্থ করে দেয় আমাদের ভাষা শহীদ ও ভাষা সৈনিকগণ। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আমরা একটা বড় বিজয় অর্জন করি। তা হলো ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করা। নির্বাচনে তত্কালীন পাকিস্তানিদের সহায়তাকারী দল হেরে যায়; হেরে যাবার পর একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। বিভিন্ন অর্জনও আসে। বাঙালিরা সে-সব আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। সেই সক্ষমতার মধ্যে একটি হলো বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা। ১৯৫৫ সালে ০৩ ডিসেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ফল এটি। আজ যে স্থানে বা বাড়িতে এটি প্রতিষ্ঠিত; তা একসময় ছিল বর্ধমান হাউস। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আজ সেখান থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি-ধর্মনীতি, দর্শন-সাহিত্য-ইতিহাস নানা বিষয় নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় তোমাদের জন্য কত রঙ-বেরঙের বই। সেই বই কিনতে আজকাল তোমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেই বইয়ের মেলায় যাও। নতুন বইয়ের গন্ধ নাও। বইয়ের ছবিতে মুগ্ধ হও। আবার সব বই যে তুমি কিন তা তো নয়। ড. হুমায়ুন আজাদ কাব্য করে লিখেছেন—‘যে-বই তোমায় দেখায় ভয়/ সেগুলো কোন বই-ই নয়/ সে-বই তুমি পড়বে না।’—সত্যিই তো, তোমরা আশাজাগানিয়া, ভয়ভাঙানি বই কিনে বাড়ি আসবে। আরেকটি কথা, স্বাধীনতার আগে এ একাডেমি গড়ে উঠলেও; বইমেলা উপভোগ্য হয়ে ওঠে স্বাধীনতার পর। সাহিত্যে অবদানের জন্য এখান থেকে পুরস্কার দেয়া হয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসে এ-মেলা উদ্বোধন করেন। আজ তোমরা ডিজিটাল যুগে বাস কর। এ যুগে ‘ই-বুক’, ‘ফেসবুক’ আরও কত কি নামে তোমরা সেখানে ব্যস্ত, তা-ই না? কিন্তু নতুন বই কিনে হাতে নেয়ার আনন্দ, গন্ধ শোঁকার আনন্দ একেবারেই আলাদা। তোমরা হয়তো বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের হাত ধরে ইতোমধ্যেই বইয়ের গন্ধ শোঁকা শুরুও করেছ। নানু-দাদুর কোলে শুয়ে গল্প শোনা ছেড়ে, বইয়ের রাজ্যে প্রবেশ করেছ। সে রাজ্যের রাজা-রানির কথা শুনতে শুনতে ভাষার জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন তাঁদের কথা ভুলে যেয়ো না কিন্তু! আরেকটি কথা, বই পড়বে আনন্দের সাথে। আনন্দের সাথে জ্ঞান অর্জনের মজাই আলাদা। সম্রাট আকবর নিজে লেখা-পড়া জানতেন না, কিন্তু তাঁকে প্রায়দিনই বই পড়ে শোনাতে হতো। ‘বীরবল’ নামে তাঁর একজন সাহিত্যরসিক মন্ত্রীও ছিলেন। সম্রাট আকবর নাকি একেকটা বইকে রাজ্যের সাথে তুলনা করতেন। একেকটা বইয়ের পাঠ শোনা নাকি তাঁর কাছে নতুন রাজ্যজয়ের মতোই ছিল। তোমাদের জগতের রাজা তো তোমরাই, তাই নতুন রাজ্য জয় করবে বই পড়ে পড়ে। দেশকে ভালোবাসবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে, মা-বাবার কথা শুনবে। সকল আদব-কায়দা শেখার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার; বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেবে তোমার প্রিয়সঙ্গী বই। প্রতি বছর বইমেলায় অংশগ্রহণ করে নিজেকে যোগ্যতর নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। বইয়ে যে-সকল উপদেশ যেমন—হিংসা-দ্বেষ-অন্যায় ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে বলে, সে-সব অবশ্যই মান্য করবে। সভ্যমানুষ বলতে যা বুঝায়; তা তোমার শিক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে। সে-প্রত্যয় নিয়ে অগ্রজ স্মরণীয়-বরণীয়দের শুভকীর্তিকে নিশান বানিয়ে তোমরাও হবে ভবিষ্যতের বরণীয়।
