ওয়ারিশ

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:১৯

আজাদুর রহমান

কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি থেমেছে। মেঘের স্পঞ্জে যেটুকু জল অবশিষ্ট ছিল তার সবটুকুই চিপে বের করে দিয়েছে আষাঢ়ের আকাশ। টাটকা রোদে চারপাশটা ঘষে ধোয়া কাঁসার থালা-বাসনের মতো ঝিকমিক করছে এখন। গত বর্ষার পর এই প্রথম মুষলধারে বর্ষণ হলো। নতুন পানি পেয়ে গাছগাছালিরাও বুঝি বহুদিন পর প্রাণ হাতে পেলো। ইচ্ছেমতো বৃষ্টির সাবান মেখেছে তারা। সদ্যস্নাত যুবতীর মতোই তাদের গা ভেজা। চুল ভেজা। বাহু-বগলের তলে, বাকলের ভাঁজে ভাঁজে চুপচুপে জল চুইয়ে পড়ছে। যেসব কিশোরী শিরিষগাছ এতদিন মুখ থুবড়ে ছিল, তারাও আজ ভাঁজ খুলে সিয়ানা শরীর মেলে ধরেছে। আফজাল মোল্লার চোখে তো কেউ নতুন করে সুরমা লাগায়নি! তাহলে! চারপাশটা নতুন করে আবিষ্কার করছেন কেন তিনি! লিভার সিরোসিস ধরা পড়ার পর থেকেই কি সবকিছু পাল্টে গেল! নাহ কিছুই পাল্টায়নি। জলের মাছ ডাঙায় না পড়লে যেমন জলের মর্ম বোঝে না, তেমনি  আফজাল মোল্লাও বোঝেননি। পৃথিবী ছেড়ে যেতে হচ্ছে, তাই হাড়ে হাড়ে চারপাশের মর্মটাকে টের পাচ্ছেন, আর মর্মাহত হচ্ছেন তিনি। এমনিতেই নরম পরিবেশ, তার ওপর কাঁচা বাতাসে বকুলের সৌরভ ভেসে বেড়াচ্ছে। বকুলতলায় যাওয়া দরকার। ভাবনাটা মাথায় আসামাত্র আফজাল মোল্লা খানিকটা মোহগ্রস্ত হলেন। তারপর নিরালেই উঠান ফেলে সুপুরি বাগিচার দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু বাগানে নামতে গিয়ে সহজ পায়ে হাঁটতে পারলেন না। হরেক আগাছায় বেশ জঙলি হয়ে আছে তলাটা। ভাটফুলের ঝোপ, ফাঁকে ফাঁকে বেলি চন্দন আর কাঠমালতী ফুটে আছে। দৃশ্যটা এমন নস্টালজিক আর নাজুক যে এক দাগে ছেলেবেলার ছবিগুলো মনে পড়ে গেল। আফজাল মোল্লার আর কী দোষ! শিক্ষিত পাড়া হলে অন্য কথা ছিল। গাঁও-গ্রামে ফুলের চেয়ে ভাতের গন্ধ অনেক বেশি দামি। জমিন আর কৃষকের শরীর এক হলেই তবে পেটে ভাত ওঠে। শহরের মতো অত রমারম পায়ে গ্রাম চলতে পারে না। হাঁটি হাঁটি পায়ে বৃদ্ধের মতো থপ থপ করে এগিয়ে চলে গ্রাম। চারপাশের সুন্দরাদির দিকে আলাদা করে নজর তোলার সময় কোথায়! তাছাড়া দৃশ্যের তর্জমা করতে হলে কম করে হলেও কিছু বিদ্যে তো পেটে থাকা চাই। পুরো গ্রাম ঘুরলে তিন জন ডিগ্রি ফেল পাওয়া যাবে। আফজাল মোল্লা ছাড়া বাকি দুই জনের কেউ-ই গ্রামে থাকেন না। চাকরি পেয়ে বহু আগেই তাঁরা শহরে বাসাবাড়ি করে ফেলেছেন। মাসে, ছয় মাসে, ঈদে-চান্দে দু-একদিনের জন্য তাঁরা কেবল গ্রামমুখো হন। পর্দানশিন সুন্দরীর মতো বিষ্টিপুর গ্রাম তাই নিজ মনে সেজেগুজে বসে থাকে। তাকে কেউ ঘাঁটায় না। মুগ্ধচোখে কেউ বলে না—আহ্ কী অপরূপা গ্রাম!

আফজাল মোল্লার বাড়িটা পুব কিনারায়। পরানদহ বয়ে গেছে বলে এরপর আর বসতি হয়নি। ওপারে গেলে ছায়াছবির মতো পাথার, একটানা মাইল তিনেক বয়ে গিয়ে কাজিপুরে ঠেকেছে। পরানদহ খালটাও দেখার মতো। এঁকেবেঁকে বিষ্টিপুরের কোনায় এসে এমনভাবে ধনুকের ছিলা হয়েছে যে, বাইরের লোকজন কদাচিত্ এ পথে এলে আনমনেই আটকে যায়। ধু-ধু চোখে চেয়ে থাকে নদীপানে। বছরে ছয় মাস পানি থাকে না। তখন পরানদহের তলপেটে ধান-সরিষা থেকে শুরু করে বারোয়ারি চাষ হয়। আষাঢ়ের আগে ফসল ঘরে তুলতে না পারলে আর উপায় থাকে না। লাগাতার বৃষ্টিতে ফুলতে থাকে পরানদহ। ফুলতে ফুলতে একসময় যমুনার সাথে কানেকশন হয়ে যায়। খাল থাকে না, হয়ে যায় প্রমত্তা নদী। হাজার নৌকো চলে। শুধু কি তা-ই! বাঁকের মুখটা তখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মতন হয়ে যায়। দ্বীপ নয়; কাশবন। জোছনা হলে তো কথাই নেই! শিমুল-কৃষ্ণচূড়া মণ্ডিত কাশবন যেন চাঁদবদনি এক অচেনা খণ্ডে পরিণত হয়ে যায়। দৃশ্যগুলো নতুন করে ছবি করতে গিয়ে আফজাল মোল্লার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। শরীর টলতে থাকে। তিনি একটা সুপুরি গাছ ধরে মাটিতে বসে পড়েন। সত্যি শরীরটা দুর্বল হয়ে গেছে। আর সামনে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না। বসে বসেই খানিক দম পাড়েন তিনি। তারপর ধাতস্থ হলে দুর্বল পায়ে ফের উঠোনের দিকে  ফিরতে শুরু করেন। মাঝামাঝি গিয়ে মাথাটা আবার চক্কর খায়। অনেকটা জোর করেই টালমাটালে হাঁটতে থাকেন তিনি। এবার আর বেশি দূর যেতে পারেন না। বড় ছেলে এক দৌড়ে এসে বগলদাবা করে ফেলে—আপনাকে না বলেছি, একা একা বাইরে আসার দরকার নাই। যখন যা লাগে, বলবেন। ডাক্তার বলেছে, এখন আপনার ফুল রেস্ট দরকার।

ডাক্তারের কথাটা আফজাল মোল্লা ভালোই জানেন। ডাক্তার বড় বড় করে বলে দিয়েছেন—দেখুন, আপনার তেমন কিছু হয়নি। নিয়মিত ওষুধ খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা করবেন না। মনকে প্রেসার দিবেন না। যা যা খেতে মন চায়, খাবেন, যেখানে যেখানে যাবার ইচ্ছে হয়, যাবেন। এত বড় বড় করে বলে দেয়ার পরও ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে আফজাল মোল্লা তেমন ভরসা খুঁজে পাননি। মানুষের মুখে বোধহয় সবকিছু লেখা থাকে। ভালো করে তাকালেই সে সব লেখাজোখা ছবি হয়ে যায়। খুব বেশি লেখাপড়া জানার দরকার আছে-তাও না। আফজাল মোল্লা হয়তো কিছুটা পড়তে পেরেছিলেন। গত বাষট্টি বছরে তো কম শিক্ষা হয়নি! নিজে এক হাতে যেমন আবাদ করেছেন, অন্য হাতে ধানের ব্যবসা করেছেন তিনি। মৌসুমে ধান কিনে, আকালে বাজারে ছেড়েছেন। মানুষ ঘেঁটে তিনি আর যা-ই হোক, খাজলতটা ভালোই বুঝতে পারেন। স্বর শুনেই তিনি কমবেশি বুঝতে পারেন, কী বোঝাতে চাইছে সে। কী কথার কী মানে! কী চাতুরি। বড় ধরনের কোনো অসুখ হয়েছে—এটা নিশ্চিত, কিন্তু রোগটা কী! সেটাই জানা দরকার।

সন্দেহটা পরিষ্কার হয়ে গেছে ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফেরার পর। সবাই বদলে গেছে। থমথমে পরিবেশ। প্রত্যেকের চোখেই আলাদা সমীহ। এটা-ওটা খাবার এনে দিচ্ছে। সেবা-যত্নের শেষ নেই। যত্নআত্তির পাশাপাশি সকলের ভিতরেই একটা আতঙ্ক কাজ করছে। একথা-ওকথার পর ডাক্তারের সেই বড় বড় করে বলে দেয়া কথাগুলোকেই যেন বোঝাতে চায় তারা—আপনার কিছুই হয়নি...। ওষুধ খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ...উপদেশ দেবার সময় মুখে ঝোলানো হাসিটা একসময় আর ধরে রাখতে পারে না তারা। কাঁদো-কাঁদো হয়ে যায়। কেউ আবার সহ্যই করতে পারে না। ছোট মেয়েটা তো রীতিমতো ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল। কান্নাকাটি শেষ হলেই কানাঘুষা চলে।

বড় ছেলে বিয়ে করে সংসার থেকে আলাদা হয়ে গেছে। একবার ঝগড়া হবার পর সে বাপের ঘরের দিকে ফিরেও তাকাত না। সেও চলে এল। পায়ের কাছে বসে হু হু করে কেঁদে ফেলল—বাবা, আমাকে মাফ করে দিয়েন। আমি কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারিনি... বাবা...। আফজাল মোল্লা হয়তো সবকিছু বুঝতে পেরেই সহজ হতে চেয়েছিলেন। নিজ থেকেই উল্টো সান্ত্বনা দিতে থাকলেন তিনি—আরে পাগল! আমার আর কী হবে। তোরা এ রকম করছিস কেন! ভেঙে পড়লে তো আমি কষ্ট পাই। পুরুষদের থামানো গেলেও মেয়েদের থামানো গেল না। মেয়েরা জামাই-বাচ্চা সাথে করে সমানে জমা পড়তে লাগল আর বাড়িসুদ্ধ কান্নাকাটি চলতে থাকল। আত্মীয়-স্বজনের চাপে তিন দিনেই বাড়ি ভারী হয়ে গেল। নানান মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাওয়া কথা কতদিন আর একজনের জন্য গোপন থাকে! আফজাল মোল্লা একদিন ঠিক বুঝতে পারলেন—রোগটা হলো লিভার সিরোসিস। তিনি এও জানতে পারলেন যে, তিনি আর তিন মাস আছেন। এরকম একটা দুঃসংবাদ শোনার পর অন্য কেউ হলে হয়তো মানসিকভাবে বিগড়ে যেত। কিন্তু আফজাল মোল্লা বিচলিত হবার পরিবর্তে আরও সহজ আর শান্ত হয়ে গেলেন। তাঁর কাছে মনে হলো, আর যা-ই হোক এবার একটু নিরিবিলি দরকার। নিজ মনে কিছু কাটাকুটি করা দরকার। এমনিতেই আত্মীয়-স্বজনে বাড়ি থৈ থৈ করছে, তার ওপর লাগাতার কান্নাকাটি আর ভালো লাগে না। মনে মনে তিনি বাড়িটা ফাঁকা করতে চাইলেন। বাড়ি অবশ্য এমনিতেই ফাঁকা হয়ে গেল। মৃত্যুর জন্য তিন মাস অপেক্ষা করার মানেই হয় না!

বাড়িটা ঠাণ্ডা হলে আফজাল মোল্লা কিছুটা নিজের মতো থাকার সুযোগ পেলেন বটে। কিন্তু নীরব হলেই হাজার রকমের চিন্তা আসছে মাথার ভিতর। হাতে গড়া ঘরবাড়ি আর মায়াভরা পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে—আফসোসে সামান্য অস্থির হলেও তিনি ঠিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন না। আল্লাহর ওপর তার বরাবরই ভরসা আছে—দয়াময় একটা ব্যবস্থা করবেন ইনশাল্লাহ। নিজের জন্য নয়; বরং ছেলেমেয়েদের কী হবে—এই ভাবনাটাই বড় হয়ে উঠে আসছে কেবল।

বিঘে ত্রিশেক আবাদি জমির কথা ভেবে খানিক স্বস্তি পেলেও স্থির হতে পারছেন না তিনি। যা আছে তাতে ছেলেমেয়েরা একবারে পানিতে পড়বে না—এই যা। কী হবে এসব দিয়ে! চোখ বুজলেই তো সব শেষ। সবকিছু পড়ে থাকবে, শুধু আফজাল মোল্লা নিভে যাবেন। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার কষ্ট অনেক বড় কষ্ট। ভালোভাবে মরতে পারাটাও একটা সফলতা। বড় ভাই রফিক মোল্লার কথাই ধরা যাক। ভালো মানুষ, মাঠ থেকে ফিরেছেন। কোনো কারণ নেই। সন্ধ্যাবেলা আচমকা পেটে ব্যথা শুরু হলো। টানাটানি করার সময় পর্যন্ত দিলেন না। দু-ঘণ্টার পাল্লাপাল্লি মাত্র। ভ্যানে করে সদর হাসপাতালে নিতে নিতেই কেল্লা ফতে। মরে গিয়ে নিজেও যেমন বাঁচলেন, অন্যদেরও বাঁচালেন। আর আফজাল মোল্লা! আরও তিন মাস মৃত্যুঘণ্টা বুকে করে বিছানায় পড়ে থাকতে হবে। ভেবে ভেবে আফজাল মোল্লা আনমনেই হাঁসফাঁস করতে থাকেন। কিন্তু মৃত্যুচিন্তাটা ঠিক বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। চারপাশে চেয়ে তিনি নতুন করে পুলকিত হয়ে ওঠেন—আহ, আগে যদি জানতাম তাহলে অন্তত সুন্দর এই পৃথিবীটাকে আরও উপভোগ করতে পারতাম! ঘরের ওপর আগবাড়িয়ে ঝুলে পড়া বাঁশের আড়াটার দিকে তাকালেন তিনি। এতদিন তো এটাকে জঙলি ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না। একবার তো তুলে দিয়ে আবাদি জমি বের করবেন বলে সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলেছিলেন। আজ মায়া হচ্ছে। জ্যোত্স্না রাতে চাঁদমাথায় বাঁশগুলো যখন বাতাসে টং টং করতে করতে নড়ে ওঠে, ধড়ফড় করে পেঁচা উড়ে যায়, তখন সত্যি অন্যরকম লাগে। আর অমাবশ্যা হলে তো আরেক রকম হয়ে যায়। হাজার জোনাকি থুকবুক করে জঙলি ঝোপে। জোনাকির বুদবুদ ছাপিয়ে উঠান থেকে বয়ে যায় হাসনাহেনার সৌরভ। আহ্! এসব মায়া ছেড়ে সত্যি কি চলে যেতে হবে! আফজাল মোল্লার মাথাটা ভারী হয়ে আসে। তিনি চোখ বোজেন, ঘুমের জন্য অপেক্ষা করেন। ঘুম কেটে কেটে ভাবনার সুতো খোলে। হাজার রকমের ছায়াছবির মধ্যে ঘুমে নির্ঘুমে বয়ে যান আফজাল মোল্লা। দিন যায়। মাস যায়। ডাক্তারের বেঁধে দেয়া তারিখ কাছে আসে। বাড়িতে আবার আত্মীয়-স্বজনরা জমা পড়তে থাকে। কারও জন্য কোনো কিছুই থেমে থাকে না। সময়ে সবকিছুই বোধ হয় একঘেয়েমি হয়ে যায়। হৈ চৈ বাড়ে, কিন্তু বাড়িতে আগের মতো আর কান্নাকাটি হয় না। বরং তর্ক-বিতর্ক চলে। জমি নিয়ে কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি হয়। মরার পর ওয়ারিশানরা কে, কোন দাগে কতটুকু জমি পাবে—তাই নিয়ে হল্লা হয়। প্রথমদিকে নিচুস্বরে চললেও দিনকে দিন গলার জোর বাড়তে থাকে। মৃত্যু পথযাত্রীকে কেউ তখন আর তোয়াক্কা করে না। আফজাল মোল্লা সব কথা শুনতে পান। মনে মনে অস্থির হতে থাকেন তিনি। চিত্কার করে বলতে চান—কী শুরু করেছিস তোরা, জমির মালিকের চেয়ে জমিটাই বড় তোদের কাছে! কিন্তু চিত্কার তো দূরের কথা, একটা শব্দও মুখে তুলে আনতে পারেন না তিনি। এর নাম কি জব-বন্ধ। অগত্যা কোনোমতে হাতটা নাড়াতে চাইলেন তিনি, পারলেন না। তার মানে সময় কি শেষ! আরো তো দিন সাতেক ছিল। খুব ইচ্ছে ছিল আর যা-ই হোক, ছেলেমেয়ের হাসিমুখ দেখতে দেখতে তিনি মারা যাবেন। কী দেখছেন তিনি! আফজাল মোল্লা ভিতরে ভিতরে যারপর নাই বিচলিত হয়ে পড়লেন। ছেলেমেয়েরা অবশ্য বুঝতে পারছে না। তারা বসে আছে ডাক্তারের বেঁধে দেয়া সময় নিয়ে। শেষ সময়ে ওদেরকে কাছে ডাকা দরকার। আফজাল মোল্লা প্রাণপণে বড় ছেলেকে ডাকতে চাইলেন—জিহ্বাটা কোনোমতে নড়াতে পারলেও কথাটা গলা দিয়ে বেরিয়ে মুখ পর্যন্ত এসে আটকে গেল। একটা ঘেষঘেষে শব্দ করে তিনি থেমে গেলেন। তারপর নাক দিয়ে এক হলকা কালো রক্ত নেমে এল। ...ঘোরের মধ্যেই বোধহয় খোদাকে ডাকতে চাইলেন আফজাল মোল্লা। আর ঠিক তখনই তিনি উড়তে শুরু করলেন। গভীর থেকে কোনো ভারী মাছ যেমন হালকা তালে ওপরের দিকে উঠে আসতে থাকে তেমন করে তিনিও ভেসে উঠতে থাকলেন। তিনি উঠছেন, উঠছেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে, গাছপালা ছাড়িয়ে, সুপুরি বাগিচা ছাড়িয়ে ওপরের দিকে পলকা পালকের মতো। ততক্ষণে তার ফেলে আসা দেহখাঁচা ধরে ছেলেমেয়েরা আছড়ে পড়েছে। এই বুঝি মরা কান্না! কৌতূহলে একবারের বেশি ফিরে তাকানোর সময় পেলেন না তিনি। সাদা সাদা অজস্র আলোক রজ্জুমালা নেমে এসেছে আকাশ থেকে। ফরফরে জোছনার ভিতর একনাগাড়ে উড়ে চলেছেন আফজাল মোল্লা।