>> মো. আশরাফুল ইসলাম সুমন
ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত তানজিনা। পড়াশোনা করছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা আবৃত্তি তার প্রিয় শখ। স্কুল ও কলেজ জীবনে কবিতা আবৃত্তির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু ঠিক সেভাবে কখনো কবিতা আবৃত্তির সুযোগ হয়নি। করোনা মহামারিতে ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ার পর নোয়াখালী থেকে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে চলে আসেন তানজিনা। লকডাউনে বাসায় বসে যখন সময় কাটছিল না তখন ভাবলেন এমন কিছু করার, যা সবসময়ের জন্য স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে। তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারি শেষে যেন বলতে পারি সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করেছি। এই ভাবনা থেকেই যাত্রা শুরু।’ সেই থেকে কবিতা আবৃত্তি চর্চা শুরু করেন তানজিনা এবং শখের বশেই শুরু করেন ‘শব্দ শিল্প’ নামে ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ। সেখান থেকেই শুরু হয় তানজিনার ‘শব্দ শিল্প’র যাত্রা।
তানজিনা জানান, ব্যক্তিগত প্রোফাইলে ২০২০ সালের প্রথম তিন মাস কবিতা আপলোড দিলাম। সেটা শুনে ফেসবুকে বন্ধুরাও পছন্দ করেন এবং আমাকে অনুপ্রেরণা দেন। এরপর সেই বছরের ৩১ মে আমি পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল চালু করি এবং পুরাতন ভিডিওগুলো আপলোড করি। তানজিনা ভেবেছিলেন তিনি যেমন ক্রাফটসহ নানা শখের কাজ করেন যা শখ শেষ হলেই বাদ দিয়ে দেন তেমন কিছু হবে কবিতা আবৃত্তির ক্ষেত্রেও। তবে বাসা থেকে তিনি শুরু থেকেই সবরকম সহযোগিতা পেয়েছেন, এখনো পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মা আমার প্রতিটা পাঠ খুব আগ্রহ সহকারে শুনেন, যা আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়।’ তবে কাজ করতে গিয়ে শুরুতে তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তানজিনা। তিনি বলেন, আমি যখন শুরু করি, তখন আমার স্কুলের এক সহপাঠী বলেছিল, এসব কবিতা কেউ শুনে না। বেশ ছোট করে দেখেছিল কবিতাকে। অপমান করেই বলেছিল—‘এসব জিনিস পাবলিক খায় না।’ কবিতাকে এভাবে বলাতে সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু কবিতাকে ভালোবেসেই পথ চলেছি। সেই কবিতাই বিনিময়ে আমাকে এনে দিয়েছে অনেক অনেক ভালোবাসা, সম্মান। আজ যারাই আমাকে শুনছেন, তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা আমার সেই ক্লাসমেটকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য।
সমস্যা এবং অর্জন মানুষকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। তানজিনাও এর ব্যতিক্রম নন। সমস্যার সম্মুখীন হলেও অর্জনের প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘অর্জন বলতে, আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি বা শিক্ষা ছিল না আবৃত্তি বা কথা পাঠে। এই ইউটিউব চ্যানেলটি চালুর পরই চর্চা করা শুরু করি। তো বিটিভি থেকে আমাকে একবার ডাকা হয় আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে, যেহেতু ওখানে বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ হয় আর এটি সরকারি চ্যানেল, অনেক চেষ্টা শিক্ষা সাধনার পর ডাক পান শিল্পীরা সেখানে এ বয়সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই আমাকে যখন বিটিভি থেকে ডাকে তখন বলা যায়— এটিই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। এরপর আরো কিছু পুরস্কার পেয়েছি। যেমন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি থেকে বাচিক শিল্পী হিসেবে ‘চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি পদক ২০২০’ লাভ করেছি।
বর্তমানে বাংলাদেশে আবৃত্তি শিল্প নিয়ে চর্চা থাকলেও বাচিক শিল্প নিয়ে চর্চা নেই বললেই চলে। যদিও এখন ধীরে ধীরে এ নিয়ে অনেকে এগিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ভারতে বাচিক শিল্পের খুব ভালো চর্চা এবং সেখানে খুব ভালো শিল্পী আছে। এই যে আমাদের দেশে ভাষা নিয়ে কাজ হচ্ছে না ফলে সেই জায়গা থেকে অনেকেই দেখা যায় যে বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলতে অনেক লজ্জা পায়; যদিও অনেকে প্রকাশ করে না। আবার অনেকে বাংলায় কথা বলার সময় এমনভাবে কথা বলে যেন ইংরেজি বাচনভঙ্গিতে বাংলা কথা বলছে। কিন্তু বাংলা যে নিজে থেকে একটা সুন্দর ভাষা এটা ওরা মেনে নিতে চায় না। তো আমরা যখন বাচিক শিল্প নিয়ে কাজ করি তখন কিন্তু বিষয়টা মাথায় থাকে। যদিও আমাদের দেশে এর স্বীকৃতি নেই।
তিনি জানান, আমি চাচ্ছি আমার কণ্ঠে আরও অনেক মানুষের কাছে শিল্পটা পৌঁছে যাক। বিশেষ করে বাংলা চর্চাকারী সবার কাছে। অবশ্য সহজবোধ্য না হলে বা কঠিন কবিতা কিন্তু সবাই বুঝতে পারেন না। তাই শুরুতেই সর্বস্তরে বাংলা সাহিত্যের কঠিন অথচ বিখ্যাত কবিতা পৌঁছে দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে যারা প্রান্তিক পর্যায়ে আছেন তাদের কাছে। তবে আমি অবশ্যই চাই আমার কণ্ঠ লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাক।
