রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বব্যাংকের চক্করে না পড়তে সতর্ক করল সংসদীয় কমিটি

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২১, ২২:৪২

প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জোর সুপারিশ করেছে এ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ‘শরণার্থীদের’ আশ্রয়দাতা দেশে অন্তর্ভুক্ত করাসহ বিশ্বব্যাংক যে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে, সেটাকে ছলেবলে ও ধানাইপানাই করে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার ‘চালাকি’ হিসেবে দেখছে সংসদীয় কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করে কমিটি বলেছে—রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনোভাবেই বিশ্বব্যাংকের ঘাপলার চক্করে পড়া যাবে না।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিশ্বব্যাংকের কথিত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়িঘর তৈরি, শিক্ষার সুযোগ, জমি কেনা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের নামে বিশ্বব্যাংক যেন ধানাইপানাই না করতে পারে সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সতর্ক থাকতে বলেছে সংসদীয় কমিটি। আমরা কমিটিকে বলেছি—রোহিঙ্গাদের সেটেলমেন্টের জন্য বিশ্বব্যাংকের এসব প্রস্তাবনা মানা যাবে না। সংসদীয় কমিটি সুস্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করেছে।

প্রসঙ্গত, শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশে অন্তর্ভুক্ত করাসহ একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবে ‘রিফিউজি পলিসি রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে ১৬টি দেশের শরণার্থী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, কাজ করা, চলাফেরা, জমি কেনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হওয়াসহ কার্যত স্থায়ী নাগরিকের মতো সব ধরনের অধিকার শরণার্থীদের দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এ বিষয়ে ইতিমধ্যে বলেছেন— সরকার বিশ্বব্যাংকের ঐ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি ফারুক খান সাংবাদিকদের বলেন, সংসদীয় কমিটি কঠোরভাবে বলেছে—রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে কোনো ধরনের আলোচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেন বলে যে, তারা শরণার্থী নয়। আলোচনার প্রথম এজেন্ডাই হবে তাদের কীভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হবে—আমরা তাদের সাময়িক জায়গা দিয়েছি। তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের থাকার জন্য ভবন তৈরি, চাকরির সুযোগ, জমি কেনার ও পড়াশুনার সুযোগের কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। সংসদীয় কমিটি এ বিষয়ে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছে—সেটা আমাদের এখানকার রোহিঙ্গাদের জন্য কেন? মিয়ানমারে এখনো যে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে তাদের আগে এসব সুযোগের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবনমান ও সুযোগ-সুবিধা সীমিত রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত

সংসদীয় কমিটির গতকালের বৈঠকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিমা দেশসমূহ ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্যাম্পগুলোতে জীবনমান ও সুযোগ-সুবিধাসমূহ বৃদ্ধি, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নানাবিধ বহুবার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে বেশি তত্পর হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যাবাসনের স্বার্থে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবনমান ও সুযোগ-সুবিধাসমূহ যৌক্তিক ও সীমিত পর্যায়ে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তাব করলে প্রধানমন্ত্রী তাতে অনুমোদন দিয়েছেন।’

করোনার টিকা বেসরকারি খাতে না দেওয়ার পরামর্শ

গতকালের এই বৈঠকে সংসদীয় কমিটি বেসরকারি খাতে করোনা ভাইরাসের টিকা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কমিটির মতে, বেসরকারি খাতে টিকা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কমিটি টিকা আমদানির ক্ষেত্রে টিকার মেয়াদ যাতে অন্তত ছয় মাস থাকে, তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।

বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

যাত্রীদের টিকিটিং ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানোর পরামর্শ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে

অংশ নিতে চান সংসদীয়

কমিটির সদস্যরা

ফারুক খান জানান, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি ছোট দল জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবেন। কমিটির সভাপতি ফারুক খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য— পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স, আবদুল মজিদ খান ও হাবিবে মিল্লাত অংশ নেন।