বঙ্গবন্ধু সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপঢৌকন

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২১, ২১:১১

পাকিস্তান আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের চেতন-অবচেতনের মধ্যে একটি স্বপ্ন প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল। আর সেই

স্বপ্ন হলো স্বাধীন-সার্বভৌম

সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন

বিংশ শতকের প্রথমার্ধের কয়েকটি দশক। অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসে রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছিল। তখন ‘খোকা’ নামে এক শিশুর জন্ম। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। যিনি পরে বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা হবেন, যার চরিত্রের মাহাত্ম্য, আত্মবিসর্জনের মানসিকতা, পরিশ্রম করার দানবীয় শক্তি এবং যার কথার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে জেগে উঠবে এ দেশের প্রতিটি মানুষ, বাঙালি জাতির হাজার বছরের পরাধীনতা ও দাস্যবৃত্তির কালিমালিপ্ত ইতিহাসকে মুছে দিয়ে যিনি উদিত করবেন স্বাধীনতার লাল সূর্য।

খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন গ্রামের আর দশটি শিশুর মতোই দুরন্ত। কিন্তু আর দশটি শিশু থেকে তার স্বাতন্ত্র্য ছিল আকাশচুম্বী। খুব কোমল-করুণ আর দয়ার্দ্র হূদয় নিয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখলে তার দয়ার্দ্র হূদয় করুণায় মথিত হয়ে উঠত। তিনি নিজেকে সংবরণ করতে পারতেন না। শীতার্ত কোনো বৃদ্ধকে তিনি দিয়ে আসতেন নিজের গায়ের গরম চাদর, ছিন্নবস্ত্র কাউকে দেখলে নিজের পরনের সার্ট দিয়ে খালি গায়ে চলে আসতেন বাড়িতে। বছরে অনেকগুলো ছাতা কিনতে হতো তার জন্য। কারণ তিনি রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট পাওয়া কোনো সহপাঠীকে ছাতা দিয়ে চলে আসতেন। হতদরিদ্র মানুষের জন্য পিতার ধান-চালের গোলাঘর খুলে দেওয়ার নজিরও আছে তার। বিচ্ছিন্নভাবে দান করার এই মানসিকতাই এক সময় সুশৃঙ্খল পর্যায়ে উপনীত হয়।

১৯৩৬ সালে চোখের চিকিত্সা নিয়ে যখন তিনি মাদারীপুরে ফিরে আসেন তখন তার বয়স ১৬ বছর। সেই সময়ই তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভক্ত হয়ে ওঠেন এবং স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই নিয়তি ফলে উঠে ১৯৩৮ সালে যখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে আসেন। বাংলার বিখ্যাত দুই মুসলিম নেতার আগমনে গোপালগঞ্জের মুসলমানেদের মধ্যে উত্সব। সুতরাং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করতে হবে, আর দায়িত্ব পড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর। তিনি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করেন।  এ সময়েই তার সঙ্গে সাক্ষাত্ হয় ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ মহা্তা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। ১৯৪২ সালে মেট্রিকুলেশন শেষ করে যখন তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান তখন থেকেই অসাধারণ প্রতিভাধর রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোরাওয়ার্দীর নিরন্তর সান্নিধ্যে তিনি বাংলার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করেন। ইসলামিয়া কলেজের রাজনীতিতে তিনি হয়ে উঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কতটা ভয়াবহ হতে পারে দ্বিতীয়বার তারও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তিনি লাভ করেন এই কলকাতা জীবনেই। এবং সর্বোপরি রাজনীতির ভেতরগত শৃঙ্খলা ও তার বিচিত্র বাঁক-মোড়, সন্ধি-সমন্বয় তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন নিবিড়ভাবে। তার এই অসামান্য যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ, নির্দেশনা পালন করার আনুগত্য, মুখের ওপর সত্য কথা সোজা করে বলার সাহস, বন্ধুবাত্সল্য, সহপাঠী ও সহযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসা ও কার্যকর সহযোগিতার মানসিকতা এবং সর্বোপরি কথার জাদুতে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করার যোগ্যতা। তার এই বিপুল প্রস্তুতি বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার পাকিস্তানশাসিত রাজনীতিতে তাকে যোগ্যতর করে তোলে। যেসব রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক কলকাতায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন পাকিস্তান শাসনামলে মূলত তারাই বাংলাদেশের রাজনীতি, সাংবাদিকতা, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ও সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। কলকাতায় তারা খুব কাছে থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের গুণাবলি লক্ষ করেছেন। ফলে প্রায় পরিচিত পটভূমিতে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতেও তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অবিসংবাদিত  নেতা হয়ে ওঠেন।

পাকিস্তান আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের চেতন-অবচেতনের মধ্যে একটি স্বপ্ন প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল। আর সেই স্বপ্নটি হলো স্বাধীন-সার্বভৌম সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। বিভাগপূর্বকালেই ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি তৃতীয় রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলেও শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ঐ আন্দোলন থেকেই।

পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীকে তাদের সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেই থামছে না, তারা বাংলা ভাষা ও তার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপরও আঘাত হানছে। সুতরাং শেখ মুজিবুর রহমান মূলত বাংলা ভাষার অধিকারের প্রশ্নে যে আন্দোলন গড়ে তোলেন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো ইস্যু হতে পারে না। শেখ মুজিবুর রহমান তার অসামান্য দূরদর্শিতার গুণে স্পষ্টভাবেই অনুধাবন করেছিলেন যে, বিচিত্র ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও পেশার এই বঙ্গভূমির জনসাধারণকে একত্রিত করার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কোনো বিষয় হতে পারে না। সুতরাং সময়ের অসাধারণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি যথার্থভাবেই দেশভাগের অব্যবহিত পরে ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা হয়ে ওঠেন এবং বাঙালি জাতিকে একটি মঞ্চের দিকে ধাবিত করতে সক্ষম হন। আর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সেই পথ ধরে তার হাতে গড়া ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল জয়, ’৬২-র গণজাগরণ, ’৬৫ সালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, ’৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পেরিয়ে ’৭০-এর নির্বাচন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষিতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লক্ষ শহিদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এবং অসংখ্য মা-বোনদের আ্ত্তবিসর্জনের পটভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সফল হয়। আর তার জন্য তিনি ও তার সহযোদ্ধাদের যে কত জেলজুলুম অতিক্রম করতে হয়েছে; কত অত্যাচার, নিপীড়র-নির্যাতন সইতে হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সেই স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু রূপ দিতে চান তার স্বপ্নের সোনার বাংলায়। তিলে তিলে তিনি গড়ে তুলতে চান দেশটিকে। আদর্শিক দিক থেকে একটি আধুনিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য তিনি ’৭২-এর সংবিধানের মূল ভিত্তি করেছিলেন চারটি স্তম্ভকে। স্তম্ভ চারটি হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। এই মূলনীতির আলোকে সোনার বাংলা গড়ার জন্য, সুখী-সমৃদ্ধশীল একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আ্ত্তমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। ১৯৭৫ সালের ২৫শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার দ্বিতীয় বিপ্লবের চারটি উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কোনো সমাপ্তি নয়। এটি উত্পাদন বৃদ্ধি, পরিবার পরিকল্পনা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং জাতীয় ঐক্যের একমাত্র পদক্ষেপ। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো শোষণমুক্ত এমন একটি সমাজ গঠন করা যেখানে কোনো অত্যাচার, দমন-নিপীড়ন, অবিচার বা দুর্নীতি হবে না এবং যার উদ্দেশ্য হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদাকে ধরে রাখা। একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের সুস্পষ্ট চারটি উদ্দেশ্য ছিল তার ঐ বক্তব্যে : দুর্নীতির মূলোত্পাটন করা, কৃষি ও শিল্প খাতে উত্পাদন বৃদ্ধি করা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। অসামান্য এই জীবনাদর্শের প্রতিপক্ষ হিসেবে সেই ’৭২ সাল থেকেই পরাজিত অপশক্তি নীরবে-সরবে অপপ্রচার চালাতে থাকে। তার ভেতরেই চিরকাল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে লালিত বঙ্গবন্ধু দেশের উন্নয়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য ইত্যাকার সব দিক থেকে দেশ যখন উন্নয়নের দিকে ধাবমান; মানুষের মধ্যে যখন ফিরে এসেছে সুখ, স্বস্তি, সুস্থিরতা তখনই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হন বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার-পরিজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীবৃন্দ। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মহান এক নেতার পর্বতপ্রমাণ স্বপ্ন অচিরেই লন্ডভন্ড হয়ে যায়। দেশ চলে যায় পরাজিত অপশক্তির হাতে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মূল্যবোধকে তারা ধ্বংস করে। বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং পাকিস্তানি আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা দীর্ঘ দুই দশক নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়। দেশে উত্থান ঘটে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির। অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ধ্বংসের শেষ সীমায় এসে পৌঁছায়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়কে কেউ ধ্বংস করতে পারে না। সুন্দর চিরকালই অপরাজেয়। গত এক যুগ ধরে তারই প্রমাণ মিলছে আমাদের যাপিত জীবনের সব স্তরে।

 

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক