শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন মোহনা বলেন, ইটপাথরের যান্ত্রিক রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রকে অলংকৃত করে আছে ৮৭ একরের এ যেন এক ছোট্ট গ্রাম। যা বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম কৃষি শিক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান। যেখানে দেখা মিলে সবুজ সমারোহের, শীতের শিশির ভেজা ঘাসের সবুজ গালিচাকে পাহারা দেয় ছায়াঘেরা দেবদারু, আর অন্য পাশে নানা রঙের পাতাবাহার। মাঝখান দিয়ে বেড়ে চলেছে ধুলোমাখানো পিচে ঘষা রাস্তা। যে রাস্তা গল্প বলে কৃষিবিদ হবার স্বপ্ন নিয়ে ক্লাসরুমের কোলাহলের পথে পা বাড়ানো একঝাঁক শেকৃবিয়ানের। আমিও আজ এই স্বপ্নবাজদের এক জন। দীর্ঘ দেড় বছরের দূরত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে কতটা মায়ার বাঁধন তৈরি হয়েছে এর আঙিনায়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. শুভ ইসলাম বলেন, অপরিচিত জায়গাটা পরিচিত হয়ে উঠল, বেশি সময় নিল না, আবারও অপরিচিত। ক্যাম্পাসে রাতভর গানের আড্ডা, চক্রবাক ক্যাফের খাবার, জয় বাংলা ভাস্কর্যে বসে গলা ছেড়ে গান, চিকনার পেঁয়াজু, চাঁদের হাটের ‘চা’। জ্ঞানের গোলি আর ট্রামপুলের মামাদের ‘চা’ সঙ্গে ভাইরালের বার্গার তো আছেই। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল জায়গাটা আমার বহু চেনা। অপরিচিত ক্লাসরুমটাকেও ভালোবেসে ফেলেছি নিজের অজান্তেই। কত রাত যে ক্যাম্পাসে আড্ডা দিয়ে, সকালের সূর্য দেখে ঘুমিয়েছি। দীর্ঘ বন্ধে এখন এগুলো কেবল স্মৃতির পাতায় জমে আছে। ক্যাম্পাসে পরিবার না থাকলেও সিনিয়র ভাই /আপুদের ভালোবাসা আর ব্যাচমেটদের সঙ্গে বন্ডিং যেন পরিবারের থেকেও বেশি। এই ক্ষুদ্র জীবনে অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি। সব হারিয়ে এখন আমার নিজের বলতে একটা ক্যাম্পাসই আছে। আমার ক্যাম্পাসটাকে আমি ভীষণভাবে মিস করি। আবারও ফিরতে চাই নজরুল তীর্থে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মাহিনুর রহমান নায়িম বলেন, শালবন বিহারের কোল ঘেঁষে লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। বছর জুড়ে পর্যটক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠা ক্যাম্পাস আজ যেন অদৃশ্য অশুভ শক্তির খপ্পরে! তাই তো আমাদের রক্ষার্থে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এখন আর সিনিয়রদের সঙ্গে গল্প করা হয় না। মুক্ত মঞ্চে কোনো কোলাহল হয় না। সবাই মিলে চড়ুইভাতি কিংবা ভ্রমণ আনন্দ উপলব্ধি করা হয় না। শেষ বিকালে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সঙ্গে বন্ধুদের আড্ডা জমে ওঠে না। নিস্তব্ধতা যেন নিত্যসঙ্গী। তবে আবার দেখা হবে নতুন অধ্যায়ে। থাকবে না কোনো দুষ্ট শক্তি। হূদয়ের মাঝখান থেকে আবার তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে সুস্থ পৃথিবীতে। আবার হয়ে উঠব মিলনমেলায়। ততদিন নিজের খেয়াল রেখ আমার ক্যাম্পাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামা নিশাত বলেন, ইট-কাঠ-পাথরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করে ফেলেছিলাম। এখনো মনে পড়ে, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে সকাল ৮টার ক্লাসের জন্য হল থেলে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে বের হওয়া। ক্যাম্পাসের বটতলা আর টিএসসি আমার সবচেয়ে পছন্দের। গান গেয়ে কত সময় পার করেছি এখানে! আহা! কী ছিল সেই সময়। করোনা এসে হুট করে বন্ধ করে দিল। ছুটিতে চলে আসলাম বাড়িতে। কে জানত? আর ফেরা হবে না এখানে। ঘরবন্দি এ জীবনে এখন বাসায় বসে স্মৃতিচারণ করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু করোনা আমার ক্যাম্পাসের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, এর সঙ্গে দেড় মাস থেকেই আমি আমার ক্যাম্পাসকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাঈমা মুন বলেন, চোখের পাতায় ক্যাম্পাসের দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো ছিল। এর মধ্যে মনে পড়ে যায়, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরনের খেলার টুর্নামেন্টের সেই দিনগুলোর কথা যার সবকিছুই অনেক মজার ছিল। ভোর বেলা যখন সবাই খেলা প্র্যাকটিস করত, আমরা তাদের দেখে শিখতাম আর মাঝে মাঝে নিজেরাও একটু আধটু চেষ্টা করতাম। এভাবেই আনন্দ মজার সঙ্গে খেলা চলতে চলতে আমরা একটা টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিলাম। অতঃপর আসল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। চারদিকে টান টান উত্তেজনা, কারণ আমাদের বিপরীত দল টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সবাই অধীর আগ্রহের সঙ্গে খেলা দেখছিলাম আর নিজেদের ডিসিপ্লিনকে উত্সাহিত করছিলাম।
