শিফারুল শেখ
জার্মিনা কাকার। বয়স ২৬ বছর। পেশায় নারী অধিকার কর্মী। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা হলাম পাখির মতো। দিন-রাত পরিশ্রম করে বাসা বাঁধি। তারপর হঠাত্ একদিন দেখি, কেউ এসে তা নষ্ট করে দিচ্ছে।’ গত শনিবার তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আসা মাজার-ই-শরিফের নারী ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর সালিমা মাজারি বলছিলেন, ‘শহর কেন, নারীদের জায়গা নেই কোথাও। তারা সবাই এখন বাড়িতে বন্দি।’ তারা তালেবানের ২০ বছর আগের ভয়াবহ আচরণটার কথা স্মরণ করছেন।
আফগানরা এখন নিজ দেশেই শরণার্থী। বাড়িঘর ছেড়ে পার্কে খোলা আকাশের নিচে খেয়ে-না খেয়ে বেঁচে আছে। কবে শান্তি ফিরবে, কবে নিজের ঘরে ফিরতে পারবে, কিছুই জানা নেই তাদের। অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায়ও খোলা নেই তাদের সামনে। পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের সহিংসতা থেকে রক্ষাই প্রথম উদ্দেশ্য। পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেকে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ফেলে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পর তালেবান অবিশ্বাস্য গতিতে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পথে। তবে তালেবান ক্ষমতায় আসলেই কি আফগানিস্তানে শান্তি ফিরবে? সেই সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী দেশগুলো ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তালেবান এভাবে ক্ষমতা দখল করলে স্বীকৃতি পাবে না।
n বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হবে আফগানিস্তান?
গত মাসে ভারত সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেছিলেন, তালেবান বর্তমান সহিংসতা চালিয়ে গেলে দেশটি বিশ্বে একটি পারিয়াহ স্টেটে (বিচ্ছিন্ন, পরাভূত স্বীকৃতিহীন, নির্বাসিত বা একঘরে রাষ্ট্র) পরিণত হবে। ব্লিনকেন বলেন, যে আফগানিস্তান তার জনগণের অধিকারকে সম্মান দেখাবে না, যে আফগানিস্তান তার নিজ জনগণের ওপর নির্মম হামলা চালাবে, সেই আফগানিস্তান হবে একটি একঘরে রাষ্ট্র। সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
আফগানিস্তান নিয়ে কাতারের দোহায় ১৯ জুলাই ও ১২ আগস্ট বৈঠক হয়। প্রথমে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন চীন, উজবেকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, কাতার, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। দ্বিতীয় বৈঠকে ছিলেন জার্মানি, ভারত, নরওয়ে, কাতার, তাজিকিস্তান, তুরস্ক, তুর্কেমেনিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ। দুটি বৈঠকের ফলাফল নিয়ে গত ১৩ আগস্টের বিবৃতিতে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, তালেবান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করলে স্বীকৃতি পাবে না। তারা দ্রুত তালেবান ও আফগান সরকারকে সমঝোতায় পৌঁছানো ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান।
আফগানিস্তানে ৩৬টি দেশের দূতাবাস ও ১০টি দেশের কনস্যুলেট রয়েছে। আর বিশ্বে আফগানিস্তানের ৪৯টি দেশে দূতাবাস ও ২০টি দেশে কনস্যুলেট রয়েছে। তালেবান যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বন্ধের ঘটনা বাড়ছে। দূতাবাস থেকে নিজেদের নাগরিকসহ আফগান অনেক নাগরিককেও সরিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নিজেদের দূতাবাসের কর্মী ও নাগরিকদের ফেরাতে সৈন্য পাঠিয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, চেক রিপাবলিক, জার্মানি, ডেনমার্ক, স্পেন, ইতালি, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট খালি করছে। অনেক দেশ আপাতত বন্ধও রাখছে।
n স্বীকৃতি আদায়ে সফল হবে তালেবান?
দোহায় আফগান সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ ছাড়াও এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতি শুরু করেছে তালেবানরা। গত মাসে তারা চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে। ঐ সাক্ষাতে বেইজিংকে তারা আফগানিস্তানের মাটি অন্য দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার হতে না দেওয়ার আশ্বাস দেয়। বেইজিংয়ের সংশয়, আফগানিস্তান উইঘুর মুসলিমদের লুকানোর স্থানে পরিণত হতে পারে। তবে তালেবান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছে, ইসলামি আমিরাত চীনকে আশ্বাস দিচ্ছে যে, আফগানিস্তানের মাটি কোনো দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ব্যবহূত হবে না।
চীন সফরের আগে তালেবান প্রতিনিধিদল রাশিয়া সফর করেছে। তারা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তান তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে নিজেদের স্বার্থে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কী করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ আলকায়েদাসহ বিভিন্ন সংগঠন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসী তালিকায় থাকলেও তালেবান নেই। তাদের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এটা রাজনৈতিক কারণেই বলে মনে করা হয়। কারণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা যায় না।
n শান্তি ফিরবে আফগানিস্তানে?
আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য সরিয়ে নেবে। তার আগে ৬ আগস্ট থেকে শুরু করে গতকাল রবিবার পর্যন্ত তালেবান ৩৪ প্রদেশের প্রায় সবই দখল করেছে। রাজধানী কাবুলও তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। যে কোনো মুহূর্তে ক্ষমতায় আসছে তারা। যদিও যুক্তরাজ্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করেছে। শনিবার আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই তার প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু তিনি তার কথা রক্ষা করতে পারেননি। তালেবান কাবুল দখল করে নিয়েছে। তিনি পদত্যাগ করছেন। তিনি দেশও ছাড়তে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র ঘানিকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছে বলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। দেশটিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হচ্ছে যার প্রধান হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলি আহমাদ জালালির নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এরই মধ্যে আফগানরা কাবুল ছাড়তে শুরু করেছেন। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হলেই দেশটিতেও শান্তি ফিরবে বলে আশা।
