পুলিশ সপ্তাহ চলিতেছে। ‘পুলিশ জনতা ঐক্য গড়ি, মাদক জঙ্গি নির্মূল করি’— এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রাখিয়া গত সোমবার হইতে শুরু হইয়া আজ ইহার সমাপ্তি ঘটিবে। এই উপলক্ষে ১৮২ জন পুলিশ সদস্যকে চারটি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ পুলিশ পদক সাহসিকতা, রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক সাহসিকতা, বাংলাদেশ পুলিশ পদক সেবা ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক সেবা প্রদান করা হইয়াছে। উদ্বোধনী ভাষণে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলিয়াছেন, স্বাধীন দেশের পুলিশ হিসাবে তাহাদের কর্তব্য অপরিসীম। পুলিশকে তিনি সব সময় আইনের রক্ষকের ভূমিকায় দেখিতে চান। দেশের প্রচলিত আইন, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধই হইবে তাহাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথনির্দেশক। প্রধানমন্ত্রী দুইটি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। প্রথমত, পুলিশের সদস্যদের নিজেদের জনবান্ধব হিসাবে গড়িয়া তোলার আহ্বান জানাইয়া জনগণের মাঝে বিশ্বাস ও আস্থা তৈরির কথা বলিয়াছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি জোর দিয়াছেন পুলিশের জবাবদিহিতার উপর। বলিয়াছেন, ভালো কাজের জন্য যেমন পুরস্কারের ব্যবস্থা রহিয়াছে, তেমনই পুলিশের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করিতে হইবে। সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ যে-কথাটি প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন তাহা হইল, পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানো হইয়াছে। তাহাদের যত দাবিদাওয়া ছিল— সবই মানিয়া লওয়া হইয়াছে। এখন প্রতিদানের পালা। আর সেই প্রতিদান তো একটাই—জনসেবা। এই ক্ষেত্রে আর কোনো অজুহাত চলিতে পারে না।
পুলিশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে সকল দেশের ক্ষেত্রেই কথাটি সত্য। তবে আমাদের মতো জনবহুল ও বিবিধ সমস্যাকবলিত দেশের জন্য যে বেশি করিয়া প্রযোজ্য— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও তাহার প্রতিফলন রহিয়াছে। তিনি শুধু যে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করিয়াছেন তাহাই নহে, একই সাথে মিয়ানমার হইতে আগত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে পুলিশের দক্ষতার কথাও উঠিয়া আসিয়াছে গুরুত্বসহকারে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সন্ত্রাস ও সংঘাত মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলিও যেখানে গলদঘর্ম হইতেছে, সেখানে বাংলাদেশের বিগত কয়েক বত্সরের স্বস্তিপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে তাকাইলেই প্রধানমন্ত্রীর উপর্যুক্ত বক্তব্যের যৌক্তিকতা অনুধাবন করা যায় সহজেই। মনে রাখা আবশ্যক যে কয়েক লক্ষ পুলিশ সদস্যের পক্ষে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা মোটেও সহজসাধ্য কাজ নহে। সর্বোপরি, আছে নানা সীমাবদ্ধতা এবং দৃশ্য-অদৃশ্য অনেক প্রতিবন্ধকতা— যাহা কাহারো অজানা নহে। আবার পুলিশের সকল সদস্য সাধু—এমন ভাবিবারও কোনো কারণ নাই। তাহাদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি ও বাড়াবাড়ির যেইসকল অভিযোগ উত্থাপিত হয়— সেইগুলিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলিয়া উড়াইয়া দিবারও অবকাশ নাই। ফলে পুলিশ বাহিনীর কতিপয় সদস্যের অসাধুতার দায়ভারও বহন করিতে হয় পুরা পুলিশ বাহিনীকে। তৈরি হয় আস্থা ও ভাবমূর্তির সংকট— যাহা মোটেও হেলাফেলার বিষয় নহে। কারণ ব্যক্তি হউক আর প্রতিষ্ঠানই হউক— তাহার ইমেজ বা ভাবমূর্তি যদি ভালো না হয়, তাহা হইলে বহু গুরুত্বপূর্ণ অর্জনও বিফলে যাইতে পারে। অতএব, এই পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ হইল, এই ভাবমূর্তি সংকট কাটাইয়া উঠা। বলা বাহুল্য, পুলিশের যিনি প্রধান দায়িত্বটি তাহার উপরই বর্তায়।
