দর্শনীয়

জিওজাইগো ভ্যালি

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২১, ২০:৩১

এর অবস্থান চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে, সিচুয়ান অঙ্গরাজ্যের একেবারে উত্তরে। তিব্বত মালভূমির অন্তর্গত মিন শান পর্বতমালার পাদদেশে। ভ্যালি অঞ্চলের মাত্র ৫০ কিলোমিটার স্থান জুড়ে রয়েছে ১১৪টি বিস্ময়কর বর্ণিল স্বচ্ছ পানির লেক, ১৭টি প্রবাহমান ঝরনা ও জলপ্রপাত, চারদিকে বিস্তৃত চোখজুড়ানো পাহাড়ি বনাঞ্চল।

জিওজাইগো শব্দের অর্থ ‘নয়টি গ্রামের উপত্যকা’। এরূপ নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক রূপকথা। স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস, তাদের পর্বত দেবতা বিয়াংদুওমিনগ্রেবারের নয় কন্যা ছিল। নয় বোনের প্রত্যেকেই ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতী ও রূপবতী। একবার এই এলাকায় ভ্রমণ করতে এসে তারা দেখল শেমোজাহ নামের এক বিষধর দৈত্য তার বিষ দিয়ে এখানকার পানি বিষাক্ত করছে। তখন সেই নয় বোন একত্রিত হয়ে দৈত্যকে পরাজিত করে। ভ্যালির সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত তিব্বতি নয় পুরুষকে বিয়ে করে নয়টি গ্রামের পত্তন করে বসবাস শুরু করে তারা। আর এই কাহিনি থেকেই অঞ্চলটির নাম হয়েছে জিওজাইগো ভ্যালি। ভ্যালির আট হাজার ফুট উচ্চতায় পাওয়া সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম থেকে বোঝা যায়, সুদূর অতীতে এর অবস্থান ছিল সমুদ্রের অতল গহ্বরে, যা হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টিকালে সমুদ্র তলদেশের মাটি ভাঁজ হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে।

জিওজাইগোতে ৭.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ ও ৫০০ গজ প্রস্থ বিশিষ্ট অর্ধচন্দ্রকার একটি লেক রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৫,০০,০০০ বছর আগে পাহাড় ধসের কারণে জিওজাইগোর একটি মুখ বন্ধ হয়ে এ বিশাল লেকের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের কাছে লেকটি ‘দীর্ঘ সাগর’ নামে পরিচিত। শুধু দীর্ঘ সাগর নয়, এখানকার অধিকাংশ লেকই সৃষ্টি হয়েছে ভূমিকম্পের ফলে পাহাড় ধসের কারণে। যদিও জনশ্রুতি আছে যে, তাদের পর্বত দেবতা তাঁর স্ত্রী পর্বত দেবীকে একটি আয়না উপহার দিয়েছিলেন, যা ছিল খুবই স্বচ্ছ। ভুলবশত দেবী আয়নাটি ভেঙে ফেললে তা ১১৪টি খণ্ড হয়ে যায়। পরবর্তী কালে এই টুকরোগুলো থেকেই সৃষ্টি হয় স্বচ্ছ পানির ১১৪টি লেক। এই লেকগুলো সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট ওপরে।

সম্প্রতি লেকগুলোতে অতিমাত্রায় ক্যালসিয়াম কার্বনেটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সে কারণেই হয়তো লেকগুলোর পানি এতটাই স্বচ্ছ যে ওপর থেকে এর তলদেশও দৃশ্যমান। তলদেশের বিভিন্ন শৈবাল ও বালির বর্ণিল হওয়ায় পানির রং সময়ে-অসময়ে নানান বর্ণ ধারণ করে। কিছু কিছু লেক অগভীর ও নলখাগড়ায় পরিপূর্ণ। নীল, সবুজ ও ফিরোজা রঙের পানিতে সজ্জিত লেকগুলো সৌন্দর্যমণ্ডিত। অধিকাংশ লেকের নামকরণ হয়েছে উপকারী জলপরী ও জলদানবের নামানুসারে; যেমন দুই ড্রাগন লেক, পঞ্চ রাঙ্গা পুল, আয়না লেক, পান্ডা লেক, ময়ূর নদী ইত্যাদি। স্থানীয়রা লেকগুলোকে বলে হাইজি; যার অর্থ সমুদ্রের পুত্র।

বর্তমানে জিওজাইগো ভ্যালি সংরক্ষিত পর্যটনকেন্দ্র। ১৯৮৪ সালে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ১৯৮২ সালে চীন সরকার এই অঞ্চলকে তাদের ভূ-স্বর্গ হিসেবে ঘোষণা করে। আর ইউনেস্কো ১৯৯২ সালে স্বীকৃতি দেয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে। এছাড়াও ১৯৯৭ সালে ভ্যালিটি ওয়ার্ল্ড বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের স্থান হিসেবে তালিকায় জায়গা করে নেয়।

মো. মিজানুর রহমান