যুক্তিসিদ্ধ চোখা সমালোচনা বা অযৌক্তিক আলোচনা অথবা ছেলেমানুষী সম্যক আলোচনা—অনেক সময় কোনোটিকেই লেখক বা নির্মাতা ভালো চোখে দেখেন না, বিরক্ত হন, বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। কখনো বা কেউ কেউ কবি জীবনানন্দ দাশের মতো বলেই বসেন, ‘বরং নিজেই তুমি লেখো নাকো একটি কবিতা।’ লেখক বা নির্মাতা, দুজনই হলেন রচয়িতা, কারো হাতে থাকে কলম, কারো হাতে ক্যামেরা, তাঁরা হলেন স্রষ্টা। সৃষ্টিকর্মের উত্পত্তি তাঁদের ভেতর থেকে হলেও, সৃজনের পর কর্মটি কি আদৌ আর স্রষ্টার থাকে? কাহলিল জিবরান যেমন সন্তানকে তুলনা করেছিলেন বাবা-মায়ের তূণ থেকে ছুড়ে দেওয়া তীরের সঙ্গে, সৃষ্টিও আদতে সেই তীরের মতোই, স্রষ্টার তূণ থেকে ছুটে যাওয়ার পর, এর উপর আর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তীরটি ছোড়ার সময় লক্ষ্য থাকে বটে, তবে ছোড়ার পর নিশ্চিত করে বলা যায় না তীরটি কোথায় গিয়ে বিদ্ধ হবে।
কবি জিবরানের মতোই উপমা টেনেছিলেন ভাষাপণ্ডিত রলাঁ বার্ত। তিনি লেখককে পিতা আর সাহিত্যকর্মকে সন্তানের রূপে দেখেছিলেন। শুদ্ধ সাহিত্য বলি কেন, চলচ্চিত্রকেও টেক্সট হিসেবে গণ্য করা যায়। লেখক বা নির্মাতা যখন নির্মাণের প্রক্রিয়ায় থাকেন, তখন তিনি আপনকার পরিবেশ, প্রতিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনীতিজাত সত্তা হিসেবেই সৃষ্টি করেন। ওই সৃষ্টি, বার্তের মতে, আগে থেকেই ‘অভিধান’ আকারে বিরাজ করে, সেখান থেকে নিয়ে স্রষ্টা নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মাত্র। অর্থাত্ সৃষ্টিকর্মের উপর তাঁর অধিকার কমে যায় সৃষ্টি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই। এরপর কর্মটির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় সমালোচকের। তবে এই সমালোচকও একই যুক্তিতে হয়ে পড়েন গুরুত্বহীন, রচয়িতার মতো। রচয়িতা ও সমালোচকের গুরুত্ব যতই কমতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে পাঠকের গুরুত্ব। আর এজন্যই বার্ত মনে করেন, রচয়িতার মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জন্ম নতুন পাঠকের। এর কারণ অজস্র পাঠক, অজস্র রকমের অনুবাদ ও অর্থের মধ্য দিয়ে রচনাটিকে পাঠ করতে থাকেন। জন্ম দিতে থাকেন সৃজনকর্মের নতুন নতুন ব্যাখ্যা। চলচ্চিত্রের বেলাতেও তা-ই ঘটে।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মিল-অমিলের বিষয়টি আমরা জানি, সেটা নিয়ে এখানে আলাপ বিস্তার না করে শুধু বলা যায়, দৃশ্যমাধ্যমকে ব্যাখ্যা করা কঠিন, কারণ একে বোঝা যায় সহজেই, সেই কঠিন কাজটি সমালোচক করেন এবং একেকজন একেকভাবে করেন। এই সমালোচনার লেখকও একজন রচয়িতা, কাজেই তার কাজেরও পাঠ হয়, পাঠোদ্ধার হয়। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পাঠকের পরিবর্তে দর্শকের অবস্থান যদি আমরা বিবেচনা করি এবং দর্শকের জীবনচর্চা ও নন্দনতাত্ত্বিকবোধকে যদি আমলে নিই, তাহলে বলা যায়, দর্শকের দেখার ভেতর দিয়েই আসলে নির্মাতার মৃত্যু ঘটে। সমালোচকও একধরনের দর্শকই বটে, কারণ তাঁরও তো ছবিটি দেখতে হয়। দেখার পর তিনি সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং নিজের সমালোচনাকর্মটি পাঠকের দরবারে পেশ করেন।
পাঠক ও দর্শকই এখানে রাজা, শেষ বিচারে তাদেরই বিজয় হয়, কারণ কাল থেকে কালান্তরে তারাই সৃষ্টিকর্মকে টিকিয়ে রাখেন। পাঠক ও দর্শক আসলে কালের সাথে তুলনীয়। কোনো সৃষ্টিকর্মের কালকে অতিক্রম করা মানে যুগযুগ ধরে পাঠক ও দর্শকের মনকেই জয় করা। তাই যখন কোনো সাহিত্য বা চলচ্চিত্র সৃষ্টি শেষ হয় তখন সেটি পাঠপূর্বক সকলের প্রতিক্রিয়া কী হয় তার দিকে তাকিয়ে থাকলে স্রষ্টার চলবে না। সৃষ্টির বাসনা থমকে গেলেও চলবে না। সৃষ্টিকর্ম চালিয়ে যেতে হবে। রচয়িতা নতুন নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মরে যাবেন, আবার জীবিতও হয়ে উঠবেন। তিনি স্বয়ম্ভূ। নিজের ভেতর থেকেই তিনি উদ্ভূত হবেন। তাই সমালোচনা বা পাঠক/দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় আসলে শিল্পীর মন খারাপ করার প্রয়োজন নেই। মন খারাপ হতে পারে, কিন্তু সেটিকে আঁকড়ে থেকে পালটা প্রতিক্রিয়া জানানোরও খুব একটা দরকার নেই। তারপরও যৌক্তিক প্রত্যুত্তর দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প না থাকলে, তখন সেটা দেওয়া যেতেই পারে। এই প্রতিজবাব দেওয়া বা না-দেওয়া নির্ভর করে স্রষ্টার হজমশক্তির ওপর। স্রষ্টা যদি সৃষ্টির পর নিজেকে মৃতবত্ প্রাণী ভাবেন, তো তাতেই মনে হয় ফায়দা অধিক। তিনি যদি নির্বিকার চিত্তে নতুন সৃষ্টির দিকে এগিয়ে যান এবং একাগ্রতা নিয়ে নিজের বক্তব্যকে সৃজনের ভেতর দিয়ে হাজির করতে থাকেন, তখন অন্যে কী বলল, তা শোনার প্রয়োজন পড়ে না।
লোকে সাধারণত সমালোচনাকে ভালোভাবে নিতে পারেন না। আজকাল সঠিক সমালোচনা যে ঋদ্ধ করে সেই বোধটা হারিয়ে যাচ্ছে, আবার সমালোচনা করা যে একটি শিল্প সেটাও অনেক সমালোচক বোঝেন না। একজন শিক্ষিত সমালোচক কখনোই কোনো কাজ নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করবেন না। কাণ্ডজ্ঞান কখনো সমালোচকের অবলম্বন হতে পারে না, জ্ঞানকাণ্ডই হবে তাঁর ভরসাস্থল। তবে এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম যেভাবে সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে অনেকেই সমালোচকের মতো ভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেন। এরা প্রকৃত সমালোচক নন, ফেসবুক ও ইউটিউবে এসে নিজের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বনে যান জনপ্রিয় সমালোচক। কিন্তু যে বিষয়ে তিনি লিখছেন বা বলছেন, সে বিষয়ের উপর তিনি কোনো সময়ই বিনিয়োগ করেননি, একটি বইয়ের দুটো পাতাও উল্টে দেখেননি। এরা ছদ্মবেশী মূঢ়। উল্টো চিত্রও আছে বৈকি। অনেক ডিগ্রিধারীও অনেকসময় শূন্যগর্ভ আলোচনা করেন। ফাঁকিটা এমন না যে ধরা পড়ে না, পাঠক ও দর্শক ঠিকই সেটা ধরে ফেলেন এবং তাদের একটা সময় পর বর্জন করেন।
যাঁরা শিল্পী হওয়ার বাসনা পোষণ করেন, তাঁদের মনে রাখা দরকার, পাঠক ও দর্শক তো বটেই, সময় স্বয়ং ভীষণরকম নিষ্ঠুর। এই নিষ্ঠুরতার কথা মাথায় রাখলেই বোধ করি বিচলিত হওয়ার অবকাশ থাকে না। তখন এমনিতেই সমালোচনার বিপরীতে শিল্পীর আচরণ হবে মৃতব্যক্তির মতোই। বার্তের হিসেবে এমনিতেই রচয়িতার মৃত্যু ঘটে। আর রচয়িতা যদি আগে থেকেই নিজেকে মৃত ধরে নেন, তাহলেও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ইঙ্গমার বারিম্যান নাকি একবার এক সমালোচকের উপর চড়াও হয়েছিলেন। বাংলাদেশের তারেক মাসুদ তো এক সমালোচকের সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন! এরকম আরো প্রচুর উদাহরণ দেওয়া যাবে, মোদ্দা কথা হলো, লেখক বলি, বা নির্মাতা, তাঁদের হয়ে যেতে হবে মুর্দা। তাই বলে সমালোচককে মুর্দাফরাশ হলে চলবে না। স্রষ্টার জীবনযাপনের আলোকে তাঁর সৃষ্টিকে বিচার করা যেতে পারে, কিন্তু স্রষ্টার জীবনটাই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে আর সেটা সৃষ্টির সমালোচনা থাকে না, জীবনীগ্রন্থের অধ্যায় হয়ে ওঠে।
সমালোচনা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এটা সাধারণত শিল্পীরা স্বীকার করতে চান না। যত কঠোর, কঠিন ও কাঠখোট্টা সমালোচনাই লেখা হোক না কেন, শেষ বিচারে সমালোচনা কিন্তু লেখক, নির্মাতা ও শিল্পীর উপকারই করে। সাধারণ মানুষও সমালোচনা-সাহিত্য থেকে শিক্ষা লাভ করেন। যে শিল্প ভালো বা মন্দ কিছুই হয়নি, মনে রাখবেন, সেই শিল্পসৃষ্টি নিয়ে কোনো সমালোচনাও হয় না। সমালোচনা, কোমল কি কঠোর, হচ্ছে মানেই ধরে নিতে হবে শিল্পীর সৃষ্টি চিন্তার পুকুরে তরঙ্গ তুলেছে। যত বেশি সমালোচনা হতে থাকবে, সেই সৃষ্টির টিকে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে থাকবে। কাজেই সমালোচনাকে স্বাগত জানান।
