আফগান বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে তালেবান যোদ্ধারা কাবুল দখল করার পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো দেশের স্বীকৃতি পায়নি তালেবান। বরং বিরোধিতা আসছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্টের ভাই হাশমত ঘানি তালেবানের পক্ষ নিয়ে বলেছেন দেশবাসীকে তালেবানের শাসন মেনে নেওয়া উচিত। আলজাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেছেন।
আফগান ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের দেশ ছেড়ে না পালানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্টের আপন ছোটভাই মনে করেন, তালেবানের অধীনে দেশের জনগণের মঙ্গল হবে। কাবুলের বাড়ি থেকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে হাশমত ঘানি বলেছেন, বিদেশি সেনা প্রত্যাহার শেষ হওয়ার মুহূর্তে আফগানিস্তানের জনগণের জন্যই কাবুলে নতুন শাসনের প্রয়োজন ছিল। পেশায় ব্যবসায়ী ও আফগানিস্তানের যাযাবর কোচি জনগোষ্ঠীর সর্দার হাশমত ঘানি কয়েক দিন ধরেই তালেবান নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর কিছু ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে।
হাশমত জানিয়েছেন, তিনি প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও ব্যবসায়ীদের প্রতি বিশেষ বার্তা হিসেবে তালেবানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। যেসব ব্যবসায়ী আফগানিস্তানের স্কুল, হাসপাতাল, দোকানপাট, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য উদ্যোগের পেছনে বিনিয়োগ করেছেন, তারাও দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। এটি আফগান অর্থনীতি ও সামগ্রিক ভবিষ্যতের জন্য ধ্বংসাত্মক।
গত ১৫ আগস্ট তালেবানের কাবুল দখলের আগমুহূর্তে দেশ ছেড়ে পালান আশরাফ ঘানি। হাশমত জানিয়েছেন, পালানোর ইচ্ছা তার কখনোই জাগেনি। তিনি বলেছেন, আমি পালিয়ে গেলে আমার লোকদের কাছে, আমার গোষ্ঠীর কাছে কী হয়ে যেতাম! আমার শিকড় এখানে, প্রয়োজনের সময় আমি পালিয়ে গেলে জনগণের কাছে তা কী বার্তা দিতো? অবশ্য বড়ভাই জীবিত অবস্থায় দেশ ছেড়ে পালানোয় খুশিই হয়েছেন হাশমত। তার মতে, যদি তিনি (আশরাফ) কোনোভাবে হত্যার শিকার হতেন, তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতো।
পশ্চিমাদের সতর্ক করলেন পুতিন : আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর এ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোকে আর নাক না গলানোর আহ্বান জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, পশ্চিমাদের অবশ্যই আফগানদের ওপর বিদেশি মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতি’ বন্ধ করতে হবে।
হট্টগোলে সাত জনের মৃত্যু: এদিকে, কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে মানুষের হুড়োহুড়ির কারণে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। এরা সবাই আফগানিস্তানের নাগরিক। তালেবান আফগানিস্তানের দখল নেওয়ার পরে বহু মানুষ যে কোনোভাবে আফগানিস্তান ত্যাগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে দেশ ছাড়তে চাওয়া হাজারো আফগানের ভিড়ে তুমুল নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে।
বাইডেনকে ক্ষমা চাইতে হবে: অপরদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আফগানিস্তান পরিস্থিতির জন্য জো বাইডেনকে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তালেবানের হাতে কাবুল পতনের পর বাইডেনকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। এবার তিনি বাইডেনকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বললেন। ‘সেভ আমেরিকা’ নামের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে দেওয়া সবশেষ বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে আনার আগেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেছেন বাইডেন। এটা ক্ষমার অযোগ্য কাজ হয়েছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে আনার আগেই মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্যও তিনি বাইডেনকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, আফগানিস্তানে থাকা আমেরিকার ৮৫ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র এখন তালেবানের হাতে। আধুনিকতম প্রযুক্তির এসব অস্ত্রশস্ত্র এখন সহজেই চীন ও রাশিয়ার করায়ত্ব হবে। এসব দেশ এই অস্ত্র দেখে নিজেরাই তা তৈরি করতে পারবে।
আইএসের হামলার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের :আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দরে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হামলার আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল রোববার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। আইএসের আফগান শাখার সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের সতর্ক করেছে। তাদের কাবুল বিমানবন্দর এড়াতে বলেছে। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্র একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে। এ সতর্কতায় কাবুল বিমানবন্দরের ফটকগুলোর বাইরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির কথা বলা হয়।
সেনা প্রত্যাহার বেদনাদায়ক : আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারকে ‘বেদনাদায়ক, বিপজ্জনক ও অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। তালেবানের হাতে কাবুলের পতনের পর দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে তিনি এসব বলেছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার হামলার পর মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সেনারাও আফগানিস্তানে অভিযানে নামে। তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ব্লেয়ার। এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের আফগানিস্তান ছেড়ে আসা বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠীকে ‘উল্লসিত’ করবে বলেও ধারণা লেবার পার্টির সাবেক এ নেতার।
