অনিয়ন্ত্রিত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রাণিকে সুপার-বাগের হুমকির সম্মুখীন হতে হবে। ইদানিং এন্টিবায়োটিক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেই এই ব্যাকটেরিয়ার (সুপার-বাগ) সংক্রমণ ঠেকাতে অধিকাংশ ওষুধই ব্যর্থ হচ্ছে। জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল এবং রাশিয়ার ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণের ৬০ শতাংশই এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। আগামীতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশকে এই এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার চ্যালেঞ্জ চরমভাবে মোকাবিলা করতে হবে। গতকাল শনিবার ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’ (পবা) আয়োজিত ‘এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ‘সুপার-বাগ’ : ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর এ বি এম ফারুকের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা করেন ডা. ফারিজা ফাইরোজ। বক্তব্য রাখেন পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, পবা’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শক ডা. মু. মুশতাক হোসেন, বিসিএসআইআর এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. কে এম ফরমুজুল হক, পবা’র সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ, বানিপা’র সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, পবা’র সদস্য মুস্তারি বেগম, এলিজা রহমান প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বর্তমানে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এন্টিবায়োটিক হচ্ছে এমন একটি ওষুধ যা দ্বারা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত রোগের চিকিত্সা করা হয়। এই সকল ওষুধের প্রতি যখন ব্যাকটেরিয়া আর সংবেদনশীল থাকে না তখনই এন্টিবায়োটিক ওই ব্যাকটেরিয়াটির বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত রোগের চিকিত্সা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে খুবই সাধারণ ইনফেকশন/সংক্রমণ-এর চিকিত্সাও জটিল হয়ে পড়ে। সারাবিশ্বে এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা এখন একটি বৃহত্ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের প্রতি একটি ক্রমবর্ধমান গুরুতর হুমকি।
গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ইউরোপেই প্রতি বছর ৩৩ হাজার মানুষ এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কারণে মৃত্যুবরণ করে। গবেষকদের ভাষ্যমতে, এই অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, যদি এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাকে রোধ না করা যায়। যদি এভাবেই এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার হার বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে অতি সাধারণ রোগেও মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।
আর্ক ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে ডা. ফারিজা ফাইরোজ বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা এন্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য সাধারণ ওষুধের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারেন না, যে কারণে তারা অনেক সময় নিজের অজান্তে এবং অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকেন। গবেষণায় এই তথ্যটিও উঠে এসেছে যে, মুদি দোকানে পর্যন্ত ওষুধ বিক্রয় করা হয়ে থাকে। এছাড়াও কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহের অপর্যাপ্ততার কারণে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পক্ষে রোগীকে পর্যাপ্ত এন্টিবায়োটিক ওষুধ প্রদান করা সম্ভব হয় না।
এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কিছু কারণ হিসেবে বক্তারা অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক সেবন করা, রেজিস্টার্ড স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ ব্যতিরেকে ভুল এন্টিবায়োটিক সেবন করা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ অনুযায়ী কোর্স সম্পন্ন না করা, এন্টিবায়োটিক-মিশ্রিত পশুখাদ্য এবং পোলট্রি-ফিড গ্রহণকারী প্রাণির মাংস খাওয়া, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে এন্টিবায়োটিক ওষুধ শেয়ার / ভাগাভাগি করে নেওয়া, প্রেসক্রিপশন ব্যতিরেকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ জনসাধারণের নিকট বিক্রয় করাকে দায়ী করেছেন।
