সমপ্রতি মাঝারি পাল্লার পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি হইতে সরিয়া গিয়াছে রাশিয়া। ইহার ভিতরে কেহ কেহ ঠান্ডা লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্বের আলামত দেখিতে পাইতেছেন। ১৯৮৭ সালের ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি’ বা মাঝারি পাল্লার পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি হইতে রাশিয়া নিজেকে প্রত্যাহারের আগে যুক্তরাষ্ট্রও এই চুক্তি প্রত্যাহারের কথা জানাইয়াছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানাইয়াছেন যে, মার্কিন বন্ধুরা এই চুক্তি প্রত্যাহার করিবার কথা জানাইয়াছেন বিধায় তাহারাও তাহাদের দিক হইতে চুক্তি প্রত্যাহার করিয়া লইল।
এইক্ষেত্রে স্মরণ করা যাইতে পারে আশির দশকের ঠান্ডাযুদ্ধের দিনগুলি। সেইসময় আমেরিকা ও তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন—দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতায় নামিয়াছিল। এইগুলি এমন ধরনের অস্ত্র যাহা লক্ষ্যে পৌঁছাইতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লইয়া থাকে। ফলে মাত্র একটি ভুয়া উেক্ষপণের বার্তায় পরমাণু যুদ্ধ লাগিয়া যাইতে পারিত যে কোনো মুহূর্তে। সেই আতঙ্ক কাটাইতে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ ওই চুক্তি স্বাক্ষর করিয়াছিলেন। কিন্তু সমপ্রতি আমেরিকার তরফ হইতে বলা হইতেছিল—চুক্তির নিয়মকানুন মানিতেছে না মস্কো। পাল্টা অভিযোগ করিয়াছে রাশিয়া। এইক্ষেত্রে নূতন করিয়া দেখা দিয়াছে ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ।
ঠান্ডা যুদ্ধের বিষয়টি প্রথম উঠিয়া আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। মার্কিন সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান ১৯৪৭ সালে সর্বপ্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ পরস্পর দুইটি পরাশক্তির অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়। সেই পরিস্থিতিকে বলা হইত দ্বি-মেরুর বিশ্ব। ওইসময় দুই পরাশক্তির জোট কোনো প্রত্যক্ষ যুদ্ধ না করিলেও দীর্ঘকাল ধরিয়া পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও যুদ্ধের আবহ বা ছায়াযুদ্ধ চালাইতে থাকে। এই ছায়াযুদ্ধেরই ইতিহাসটি ‘ঠান্ডাযুদ্ধ’ বা স্নায়ুযুদ্ধ নাম পরিচিত। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙিয়া যাইবার পর এই স্নায়ুযুদ্ধের প্রশমন ঘটে। অতঃপর পুতিনের জামানায় ঠান্ডাযুদ্ধ প্রায়শই নূতন মাত্রায় শুরু হইবার আলামত দেখা যাইতেছে। ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি’ চুক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকা অভিযোগ করিয়াছে যে, রাশিয়া পাঁচশত হইতে পাঁচ হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের মধ্যবর্তী এমন এক ধরনের ক্রুজ মিসাইল তৈরি ও ব্যবহার করিতেছে যাহা চুক্তি অনুযায়ী তাহারা করিতে পারে না। আমেরিকা জানাইয়াছে যে, এই চুক্তি ছয় মাসের মধ্যে তাহারা খারিজ করিয়া দিবে, যদি রাশিয়া ওই ক্রুজ মিসাইলগুলি নষ্ট না করে। অন্যদিকে রাশিয়া বলিতেছে, এমন ধরনের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র তাহাদের হাতেই নাই। তাহারা বরং পাল্টা অভিযোগ করিয়াছে যে, ২০১৭ সালেই মার্কিন কংগ্রেস মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দ করিয়াছে।
দেখা যাইতেছে, এই ধরনের দাবি-পাল্টা দাবির মুখে ওই চুক্তিটিই আসলে ভাঙনের মুখে। আর তাহার ছায়াতলে গজাইয়া উঠিতে চাহিতেছে ঠান্ডাযুদ্ধের নূতন চারা। ইহা কাম্য নহে। তবে দর্শক হিসাবে বাকি বিশ্বের বসিয়া বসিয়া দেখা ছাড়া খুব বেশি কিছু করিবার আছে কি?
