কৃষিবান্ধব সরকার কতটা কৃষকবান্ধব?

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০১

কৃষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সামপ্রতিক সফলতা অভূতপূর্ব। বিশেষত গত কয়েক বছরে কৃষির ধারাবাহিক সফলতা কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ গৌরবের সাথে বলে থাকেন। গবেষণা, সমপ্রসারণ, কৃষকের পরিশ্রম এবং সরকারের কৃষিবান্ধব প্রচেষ্টার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এটাও ঠিক স্বাধীনতার পরপরই পরিস্থিতি এমন ছিল না। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। আর সেক্ষেত্রে কৃষক-শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্দেশ্যই ছিল প্রধান। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বঙ্গবন্ধু কৃষির দিকে দৃষ্টি দিলেন। গবেষণা, সমপ্রসারণ, উপকরণ সরবরাহ—সব দিক থেকে কৃষি উন্নয়নের চেষ্টা করা হলো, কৃষিবিদদের চাকুরিকে আপগ্রেডও করলেন। পরিবর্তন এলো কৃষিতে। ঘটল কৃষির অভূতপূর্ব উন্নয়ন।

বাংলাদেশে একসময় ৭ কোটি মানুষকে খাওয়ানো কঠিন ছিল। এখন ১৭ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উত্পাদন হচ্ছে। বেড়েছে ধানের উত্পাদন, গমের উত্পাদন। শাকসবজির উত্পাদনেও সক্ষমতা বেড়েছে। মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হয়েছে, পশুপালন ও হাসমুরগির খামারেও অগ্রগতি এসেছে। কৃষির এই উন্নয়ন অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছে। খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টি, পুষ্টি সরবরাহ, মাছ, সবজি ও ফল রপ্তানি মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দারিদ্র বিমোচন ইত্যাদি ক্ষেত্রে কৃষি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

মত্স্য চাষ, পশুপালন, হাস মুরগির খামার ইত্যাদির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান। কৃষিক্ষেত্রে সরকারের নীতি কৃষিবান্ধব, এ কথা সবাই বলেন। বিশেষত ফসল উত্পাদনে সরকারের নানা সহায়তা বিদ্যমান। সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে সহায়তা, বীজের সরবরাহ বৃদ্ধি, গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন কৃষিকে সামনে এগোনোর পথ করে দিয়েছে।

তবে সামষ্টিক উন্নয়নের দৃষ্টিতে কৃষির উন্নতি হলেও কৃষক সংকটে আছেন। কর্পোরেট যুগে কৃষি ব্যবসায়ের নিয়ন্ত্রণ বড় বড় ব্যবসায়ীর হাতে। কেউ উপকরণের ব্যবসা করছেন কেউ কৃষিপণ্যের ব্যবসা করছেন, কিন্তু কৃষকরা উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারছেন না। কৃষি এক শ্রমনিবিড় সৃজনশীল কাজ। এখানে চালাকির কোনো জায়গা নেই। মাছকে কম খেতে দেবেন তো মাছের বৃদ্ধি হবে না, জমিতে জৈব উপাদান ও অন্যান্য খাদ্য কম দেবেন তো ফলনও ঠিকমত হবে না। অর্থাত্ কৃষককে যত্ন নিয়েই কাজটি করতে হয়। কিন্তু কৃষি উপকরণ অর্থাত্ সার, সেচ, বীজ, কীটনাশক বা ঔষধ তাদের ক্রয় করতে হয় বড় উদ্যোক্তাদের নির্ধারিত দামে। আবার উত্পাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্যও নির্ধারণ করে মধ্যস্বত্ত্বভোগী পাইকার, আড়ত্দার। অর্থাত্ কৃষক বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে যে ফসল উত্পাদন করেন, সেটা তার জন্য কখনোই লাভজনক হয়ে ওঠে না। পুরো মুনাফার বড় অংশ ভোগ করেন পিছনের ও সামনের কুশীলবরা। উত্পাদন বেশি হলে কৃষকদের আরো বিপদ। চাহিদা সরবরাহের সূত্রে তখন দাম কমে যায়, কৃষকের হাড়ভাঙ্গা শ্রমও হয়ে পড়ে মূল্যহীন।

সরকারের তরফ থেকে কৃষকদের অধিকার রক্ষার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। ধান চালের ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ করা হলেও এর সুফল পায় মূলত চালকল মালিকরা। সবজি, মাছ রপ্তানির প্রণোদনা পায় রপ্তানীকারকগণ। সেচে বিদ্যুত্ বিলের সহায়তা পায় সেচযন্ত্রের মালিক। কৃষকের উপর তার প্রভাব খুবই সামান্য।

সারের ভর্তুকী সকলের ক্ষেত্রেই সমান। একদল বড় ব্যবসায়ী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চাষাবাদ করছেন, তিনি যে হারে সহায়তা পাচ্ছেন, একজন প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেত্রেও সহায়তা সমান। এর অর্থ, বড়রা বেশি সুযোগ গ্রহণ করছেন। ঋণের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান। ব্যাংকগুলো বড় ঋণে বেশি আগ্রহী, ছোট ঋণ তাদের জন্য লাভজনক নয়।

একেকটি উত্পাদন মৌসুমের শুরু ও শেষে সবচেয়ে বিপদে পড়ে কৃষকগণ। তারা ফসল ফলান, তাদের উত্পাদিত ফসলে নিশ্চিত হয় খাদ্য নিরাপত্তা কিন্তু তাদের জীবনে কৃষি কতটা সহায়ক সেটি কি কখনো দেখা হচ্ছে? তরুণরা কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, নতুন প্রজন্ম কৃষিকে গ্রহণ করছে না, প্রান্তিক কৃষক জমি বিক্রি করে চলে যাচ্ছে নগরে কায়িক শ্রম বিক্রির জন্য, আর হাজার হাজার বিঘা জমি চলে বড় উদ্যোক্তাদের হাতে। কৃষির এই ধরনের প্রবণতা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি কোনো সিন্ডিকেডের কাছে আটকা পড়বে—সেটা ভেবে দেখার বিষয়।

সরকারের কৃষিবান্ধব নীতিমালা ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টিতে অবদান রাখলেও দেড় কোটি কৃষক পরিবারের জন্য কতটা ইতিবাচক অবদান রেখেছে, সেটা মূল্যায়নের সময় এসেছে। সরকারের কৃষিবান্ধব কাজটি কতটা কৃষকবান্ধব— সেটিও বিশ্লেষণ করা জরুরি। 

n লেখক : উপস্থাপক, মাটি ও মানুষ,

বাংলাদেশ টেলিভিশ