>> রায়হান রাশেদ
নরসিংদী রায়পুরা মাঝেরচরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন রাসেল। নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন ২০১৪ সালে। চাকরি করছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নরসিংদী শাখায়। মানুষকে ভালোবাসেন; মানুষের জন্য কাজ করেন। সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুর জন্য করেছেন ভ্রাম্যমাণ স্কুল ‘পথকলি’। এবার পাঁচ বছরের পড়লো পথকলি। করোনাকালেও পথকলিদের পড়াশোনা থেমে যায়নি। প্রতি শুক্র ও সোমবার বিকেলে নরসিংদী স্টেশন পার্কে তাদের নিয়ে বসেন রাসেল। শিক্ষার্থী আছে ৬২ জন। বাংলা ও আরবি শেখান। আরবি পড়ানোর জন্য একজন হুজুর ঠিক করেছেন। তিনি এসে পড়িয়ে যান। রাসেল পড়ান বাংলা। মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেন। মটিভেশনাল কথা বলেন। শিশুরা এখন পড়তে জানে, ছড়া কাটতে জানে। রিডিং জানে। পড়াশোনা শেষে রাসেল তাদের খাবারও দেন। পথকলির প্রথম ব্যাচের অনেক ছাত্র স্কুলে ক্লাস ফোর, ফাইভে পড়ছে। তাদের মধ্যে সবুজ, ইমদাদ, রহিম স্কুলে বেশ নাম করেছে। তাদের সার্বিক দেখাশোনা করেন রাসেল। এখন স্কুল খুললে পথকলির অনেকেই ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে ভর্তি হতে পারবে। রাসেল বলেন, ‘দুদিনই পড়াশোনা শেষে মুরগ-পোলাও খেতে দিই। খাবার দিলে তাদের আগ্রহ থাকে বেশ। আমি নিজেই খরচ বহন করি। ব্যাংকে চাকরি করে যা পাই, তার অর্ধেক এখানে ব্যয় করি। কেউ দিতে চাইলে বলি, খাবার কিনে খাইয়ে যান।’ করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও রাসেলের পথকলি খোলা আছে। পথকলিদের জন্যই খোলা রেখেছেন। রাসেল বলেন, ‘তারা পথে পথেই থাকে। খাবার তালাশ করে। আমি যদি স্কুলটা বন্ধ করে দিতাম, তাহলে তাদের পড়াশোনায় গ্যাপ পড়ে যেত। এখন তাদের খাবার দিচ্ছি, সঙ্গে পড়াচ্ছি। সেইসঙ্গে তাদের মাস্কও দিচ্ছি।’
তখন ২০১৬ সাল। শুক্রবার বিকেল ৩টায় হাজির হয়ে যেতেন কলেজের শহীদ মিনারের সামনে। ৫০-৬০ জন ঠিকই জড়ো হয়ে যেত। হাসি-ঠাট্টা চলে কিছুক্ষণ। তারপর অক্ষর চেনানো আর গণনা শেখানোর কাজ চলে। রাসেল বললেন, ‘কলেজে ওদের ছেঁড়া কাপড়ে ঘুরতে দেখে খারাপ লাগত। আরো খারাপ লাগত, ওদের মানুষের কাছে হাত পাততে দেখে। তো বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে শুক্রবার দিনটা বেছে নিলাম। এখন ওদের অনেকেই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। ছড়াও কাটতে পারে। ওদের সঙ্গে থাকতে আমার ভালো লাগে।’ শুরু থেকেই রাসেল প্রতি ঈদে ওদের কাপড় দেন। রান্না করা খাবার দেন। পয়লা বৈশাখে জামা কিনে দেন। রমজানে পুরো মাসজুড়ে ওদের জন্য ইফতারির ব্যবস্থা করেন। মৌসুমি ফল দেন। দুই বছর ধরেই রাসেল জন্মদিন পালন করেন পথশিশুদের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে কেক কাটেন। খান এবং খাইয়ে দেন। ওরাও রাসেলের জন্য ফুল নিয়ে আসে; চকলেট গিফট দেয়।
ওদের জন্য কাজের ক্ষেত্রও তৈরি করছেন রাসেল। যেমন, খালপারের বেকার নীরব। রাসেল তাকে একটা পাত্র আর ২০০ টাকার চানাচুর কিনে দিয়েছিলেন। নীরব সেগুলো ফেরি করে বেড়াত। এখন নিজেই চানাচুর বানাতে শিখে গেছে। এমন গল্প আছে হূদয় দাসেরও। হূদয় এখন বাদাম বিক্রি করে। ভালোই চলছে। পথশিশুদের জন্য স্থায়ী একটি স্কুল ও লাইব্রেরি করার স্বপ্ন দেখেন রাসেল।
