সম্ভাবনাময় পাহাড় অর্থনীতি

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১২

এম. এ. মাসুম

 

প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য অঞ্চলসমূহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড়। এটি প্রাকৃতিক সম্পদেও ভরপুর। এখানে পর্যটন এবং পাহাড়ি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্ভাবনা আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পর্যটন শিল্প। ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় চাঙ্গা হয়েছে পাহাড়ের অর্থনীতিও। ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট বৃহত্তর পার্বত্য চট্টাগ্রাম আঞ্চলে প্রচুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ায় বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন স্পট নীলাচলের কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ে। মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের লেকের স্বচ্ছ জলে, আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু, কাপ্তাই লেক, সাজেক ভ্যালি এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা সুরঙ্গর মতো দর্শনীয় স্থানগুলোয় সারাবছরই পর্যটকদের চলাচলে  মুখরিত থাকে। পর্যটন শিল্পের বিকাশে পাহাড়ের অর্থনীতি ক্রমেই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আবাসিক হোটেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেস্টুরেন্ট এবং হস্ত শিল্পের তৈরি শোপিস, তাঁতের কাপড়ের দোকানসহ ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলোর বেচা বিক্রিও জমে উঠে। পর্যটকবাহী গাড়িগুলোসহ পরিবহন ব্যবসাও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এসব জায়গায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউজ এবং সরকারি রেস্টহাউস। পাহাড়ি আদিবাসী জনগণের উত্পাদিত এবং সংগৃহিত নানা কিছু ছড়িয়ে গেছে দেশের নানা প্রান্তে। জাতীয় জীবনে এসবের গুরুত্ব ও চাহিদা সীমাহীন। সুন্দরবনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক মধু আহরণ ও সংগ্রহ করা হয়। আর এ মধুর এক ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে, তৈরি হয়েছে অবকাঠামোগত বাজার।

আবহাওয়াগত দিক দিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে বিভিন্ন ফল চাষাবাদের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কমলা। বান্দরবানের পাহাড়ে এখন লাভজনক ফসল কমলা। জুমচাষে যাদের অর্ধ বছরের অন্নও জোগান হতো না, তাদের অনেকেই এখন সচ্ছল কমলাচাষি। ফলে প্রতি বছরই কমলার বাগান বাড়ছে। পাহাড়ে নাগপুরী, ওয়াশিংটন লেভেল ও স্থানীয় জাতের কমলার আবাদ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত অর্থ বছরে ২ হাজার ৯৩ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে কমলার আবাদ হয়েছে। উত্পাদন হয়েছে ৩১ হাজার ৩৯৫ টন। কমলা পাহাড়ের পাদদেশে যেখানে দিনের প্রথমার্ধে সূর্যের আলো ও দ্বিতীয়ার্ধে ছায়া পড়ে অর্থাত্ পূর্বমুখী পাহাড়ে ভালো হয়। এছাড়া, পাথর পানি ধরে রাখে, তাই পাথর থাকায় পাহাড়ে কমলা গাছ সারাবছর পর্যাপ্ত পানি পায় বলে ফলনও ভালো হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে উত্পাদিত আনারস, কাঁঠাল, কলা, লেবু ইত্যাদি দেশের প্রচুর চাহিদা পূরণ করে আসছ। বলা চলে পাহাড়ে মিশ্র ফলের এ চাষ কৃষি সেক্টরে বিপ্লব এনেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মাল্টার মতো ফলের উত্পাদন। কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইন আদিবাসীরা সামুদ্রিক শুঁটকি ও নাপ্পি নামের এক ধরনের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকি উত্পাদন করে। লবণ উত্পাদনেও জড়িত আছে রাখাইন ও কিছু তঞ্চঙ্গা পরিবার। নাপ্পি ও সামুদ্রিক শুঁটকি জোগান দিয়ে চলেছে উপকূলীয় অঞ্চলের আদিবাসী জনগণ, যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেশের বাইরে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে রফতানিও হয়। পৃথিবীর অনেক দেশ পাহাড়ের সৌন্দর্যকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে অনেক দেশ ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকার পাহাড় কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প সেদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া, ভারত ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের অর্থনীতির দ্বিতীয় বা তৃতীয় খাতই পর্যটন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমাদের দেশেও পাহাড়কে কেন্দ্র করে যে পর্যটন সম্ভাবনা আছে তাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে।