আনিসুল হক
হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্র আমরা লাভ করি ১৯৭১ সালে, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই যাত্রা কেবল ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয়নি, ১৬ ডিসেম্বরে শেষ হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতেও শুরু হয়নি বাঙালির স্বাধীনতাযাত্রা। ১৯৪৭-এর আগেই আমাদের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা শুরু করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের পরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেন। ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু হয়ে গেল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগান নিয়ে বড় আন্দোলন। সেই আন্দোলনে হরতাল করতে গিয়ে গ্রেফতার হলেন ২৮ বছর বয়সী শেখ মুজিব।
আমাদের পিতৃপুরুষেরা কত যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কত অশ্রু, কত রক্ত, কত ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের।
সেই গল্প একেবারে গল্পের মতো করে লিখে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার একটা উচ্চাভিলাষী পরিশ্রমসাধ্য কাজে হাত দিয়েছিলাম ২০১১ সালে। ২০১২ সালে লিখলাম ‘যারা ভোর এনেছিল’। বালিকা রেনুর সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তরুণ শেখ মুজিবের। তিনি ছাত্র আন্দোলন করছেন। সুভাষ বসুর ভক্ত। সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য। আবুল হাশিমের পাঠচক্রের সদস্য। সেখান থেকে পাকিস্তান হলো, ভাষা আন্দোলন শুরু হলো। মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা, তাজউদ্দীন আহমদ, মানিক মিয়া থেকে শুরু করে বেগম মুজিব, কিংবা রফিক, বরকত, সালাম, শফি... এই নক্ষত্রের মতো থোকা থোকা গুচ্ছ গুচ্ছ অবিস্মরণীয় নামগুলো হয়ে উঠল আমার বইয়ের চরিত্র। এই সিরিজে আমার দ্বিতীয় বই উষার দুয়ারে। গত বছর বেরোল ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’। এ বছর লিখেছি ‘এই পথে আলো জ্বেলে।’ এ বছর আমরা পেরুলাম ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা।
এই ফেব্রুয়ারিতে আমরা পালন করছি গণঅভ্যুত্থানের ৫০ বছর। ঠিক এই সময়ে আমার কাহিনি এসে মিলিত হলো গণঅভ্যুত্থানের মোহনায়।
নানা গ্রন্থ পাঠ করে তথ্য নিয়ে সেগুলোকে একটা কাহিনি রেখায় সাজানোর চেষ্টা করেছি আমি। প্রয়াস পেয়েছি সংলাপ, বর্ণনার মাধ্যমে চরিত্র এবং ঘটনাকে ছবির মতো চোখের সামনে মূর্ত করে তোলার। ইতিহাস রস-কষহীন, কিন্তু আমার চেষ্টা উপন?্যাস রচনার। যাতে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে পড়তে সহজ লাগে।
আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন আমাদের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাই দিয়ে যাচ্ছে আমাদের সার্বিক বিজয়ের প্রাণশক্তি। আমরা যে ক্রিকেটে ভালো করছি, অর্থনীতিতে ভালো করছি, আমাদের গড় আয়ু বেড়ে যাচ্ছে; এমডিজি আমরা অর্জন করতে পেরেছি; এর মূলে আছে স্বাধীনতার শক্তি। কিন্তু এই স্বাধীনতার পেছনে যে মানুষগুলোর অনেক সংগ্রাম, দূরদর্শিতা, আত্মদান, আত্মত্যাগ আছে; সেই গল্প তো নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের বলে যেতে হবে। অনেকে বলছেন। অনেকে কাজ করছেন। আমিও কাজ করছি। ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৯৬৯ পর্যন্ত আসতে পেরেছি চারখণ্ডে। আগামী বছর ১৯৭৫ পর্যন্ত আসতে চাই। পাঠকদের শুভেচ্ছা প্রার্থনা করি।
একটা গাড়ির উইন্ডশিল্ড থাকে বড়। পেছনে দেখার আয়নাগুলো থাকে ছোট। কিন্তু পেছনে না দেখে কেউ সামনে এগুতে পারে না।
আমাদের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যেতে পারে সঠিক গন্তব্যে।
লেখক: কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
