‘পরিবারে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু এলে দায়ভার মাকেই নিতে হয়’

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২১, ১৯:৫৯

 

আমাদের সমাজে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন একটি শ্রেণি আজও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক কথা বলে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশু জন্মানোর পেছনে কোনো না কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা থাকে। পাপের ফল নয়। যার মধ্যে ডাউন সিনড্রোম একধরনের নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা। কী এই ডাউন সিনড্রোম যার বিস্তারিত নিয়ে কথা হয় ডিজঅ্যাবলড রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন ডিআরআরএ-এর এর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে। তিনি নিজেও একজন ডাউন সিনড্রোম সন্তানের মা।

 

n ডাউন সিনড্রোম শিশুর বৈশিষ্ট্য

ডাউন সিনড্রোম মানব দেহের একটি জিনগত অবস্থা এখানে মানুষের ২১তম ক্রমোজমের সঙ্গে অতিরিক্ত  ক্রোমোজম বিদ্যমান থাকার কারণে ঘটে থাকে। সাধারণত গর্ভাবস্থায় এই অতিরিক্ত জিনগুলোর পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে এবং সন্তান জন্মের পর থেকে শুরু করে ব্যক্তির জীবনের সমস্ত সময় জুড়েই এর প্রভাব অবিরত/চলমান থাকে। ডাউন সিনড্রোম আছে এমন প্রতিটি ব্যক্তি শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তীয় ও আচরণগতভাবে স্বতন্ত্র হয়। শারীরিক ভিন্নতা দৃশ্যমান থাকে, যেমন, হাত-পা ও মুখের আকার বা ধরন। একজন সাধারণ শিশুর তুলনায় তাদের বুদ্ধির বিকাশ অনেকটাই কম হয়। ডাউন সিনড্রোমরা কেয়ারগিভার সহায়ক উপকরণ এবং সার্বক্ষণিক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। 

 

n আমাদের দেশে এসব শিশুর অবস্থা কেমন

সরকারের চলমান প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার হিসেব মতে বাংলাদেশে আনুমানিক ৪ হাজার ৮৫০ জন ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তি আছেন। ডাউন সিড্রোম নিয়ে কাজ করছেন এমন সংগঠনদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তি রয়েছেন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় ও একীভূত উন্নয়নে কাজ করে এবং কোভিডকালীন সমীক্ষায় দেখেছি ডাউন সিনড্রোম আছে এমন প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারের মাসিক উপার্জন ১০ হাজার টাকা এবং তার চেয়ে কম। করোনা পরিস্থিতি তাদের ভবিষ্যত্ জীবন যাপন আরো ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। মায়েরা পড়ছেন আরো বিপদে।

 

n কীভাবে

পরিবারে যখন এমন শিশু আসে তখন তার সার্বিক দায়িত্ব মায়ের থাকে। আবার মা বলেই সে শিশুকে কেন্দ্র করে তার জীবন উত্সর্গ করে। আবার পরিবার প্রতিবেশীর কথা শোনে। কোথায় কী করতে হবে তাও সে জানে না। ২০ বছর আগে আমার শিশুর যখন জন্ম হয় তখন আমিও জানতাম না তাকে কোথায় নিয়ে যেতে হবে। সব মিলিয়ে মাকেই বেশি সহ্য করতে হয়।

 

n কোভিডের সময় তাদের কী অবস্থা

আমরা একটা সমীক্ষা করি। সমীক্ষায় দেখা যায়, কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতে ৫৪ শতাংশ শিশু মাঝারি স্তরের ক্ষতিগ্রস্ততার মধ্যে রয়েছে। ২০ শতাংশ উচ্চমাত্রায় ১৯ শতাংশ কম এবং মাত্র ৩ শতাংশ খুব কম ঝুঁকির স্তরে রয়েছে বা অবস্থান করছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কোভিড-১৯ এ ডাউন সিনড্রোম পরিবারের অভিভাবকদের প্রায় সকলেই কর্মসংস্থানের ঝুঁকির মধ্যে অছে। বিভিন্ন সেবার অপ্রতুলতার পাশাপাশি আর্থিক সংকট খুবই বেশি।

 

n তাদের জন্য আপনাদের সুপারিশ কী

ডাউন সিনড্রোমে ৬১ শতাংশ পরিবারের শিশুরা জানিয়েছেন যে, তাদের মহামারি পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। যাদের ৬৬ শতাংশ খাদ্য বা ত্রাণসহায়তা এবং কম সংখ্যার চাহিদা রয়েছে শিক্ষা উপকরণের। এই মহামারিতে ২৭ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্য জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন সেক্টরের জনগোষ্ঠীর মতন ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তিদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তিদের আয়-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। করোনা ভ্যাকসিন টিকা নেওয়ার একটা উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করে দ্রুত টিকা প্রদান চালু করার সুপারিশ করছি।

 

n তাদের মূল ধারায় আনা সম্ভব

নিয়মিত বিশেষ পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ, থেরাপি ও চিকিত্সা সেবার মাধ্যমে আর সবার মতো ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তিরা সমাজের মূলধারার একীভূত হতে সক্ষম। আর দশজনার মতন তাদের হতে পারে স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ। এই বিশেষ জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ছবি :জাহিদুল করিম সেলিম