কোভিড-১৯-এর ভয়াল থাবায় থমকে গেছে জনজীবন। দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান করোনার জাঁতাকলে পড়ে অনেকেই হারিয়েছে পরিবার-পরিজন এবং পেশা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক কর্মপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বন্ধ। এতে কাজ হারানোর পাশাপাশি অনেকেই নিষ্ক্রিয় বসে আছে। যাদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যানুসারে, ২০২০ সালে সারা বিশ্বে তরুণদের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে ২৫-এর বেশি বয়সি মানুষের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। যাদের এদেশের কর্মসংস্থানে অবস্থান অপ্রতুল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, তরুণ জনগোষ্ঠীর সব চেয়ে বেশি ভারতে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ, চীনে ২৬ কোটি ৯০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ৬ কোটি ৭০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রে ৬ কোটি ৫০ লাখ শ্রম দিয়ে নিজ নিজ দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে এদেশের তরুণরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অথচ তরুণদের বড় একটি অংশ আজ নানা সংকটে নিমজ্জিত। বেকারত্ব, হতাশা, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ফলে অনেক তরুণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদক সেবন ও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। তরুণদের এই পশ্চাত্পদতার জন্য আমাদের দেশের অপরাজনীতিও দায়ী বটে। যার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ । সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে, মাদকাসক্তের হার দিন দিন বাড়ছে। যুবসমাজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। মাদক জীবনকে এক ভয়াবহ পরিণামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা—মানসের জরিপ বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি মাদকাসক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, ল্যাটিন আমেরিকার পর ভয়াবহ মাদক উত্পাদনকারী দেশ দুটি, একটি আফগানিস্তান অন্যটি মিয়ানমার। মিয়ানমার বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ, ফলে সীমান্ত এলাকাগুলোর কাছাকাছি ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক উত্পাদনকারী কারখানা থাকায় বড় ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। মাদক উত্পাদনকারী দুটি অঞ্চল হলো গোল্ডেন ট্রায়াংগেল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্ট। গোল্ডেন ট্রায়াংগেলের মাদকদ্রব্য উত্পাদনকারী তিনটি দেশ হলো মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং লাওস। গোল্ডেন ক্রিসেন্টের দেশগুলো হলো পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরান। সুতরাং ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশ মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বাংলাদেশে যারা মাদকাসক্ত তাদের অধিকাংশের গড় বয়স ১৮ থেকে ৩২ বছর। মাদকের নেশা এখন নগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রামেও ছড়িয়েছে। আমাদের দেশে কিশোর সন্ত্রাসীদের ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে তার অন্যতম কারণ মাদক। দেশের সর্বত্র স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা, গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যের পিছনেও মাদকের প্রভাব রয়েছে। তাই বেকার সমস্যার আশু সমাধান করে তরুণ ও বেকারদের মধ্য থেকে মাদকাসক্তি দূর করতে হবে; মাদকের বিক্রয় ও বিপণন নিষিদ্ধ করতে হবে। মাদকাসক্তি দূর করতে কিশোর ও যুব সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাদকদ্রব্যের প্রচার ও প্রসার বন্ধ করা, নজরদারি বৃদ্ধি এবং মাদকদ্রব্য ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে দেশ ভবিষ্যতে একটি মাদকমুক্ত জাতিতে পরিণত হবে। তবে প্রগতিশীল রাজনীতিও আগের মতো শক্তিশালী নয়। যে কারণে সমাজের সব ক্ষেত্রেই জেঁকে বসেছে সুবিধাবাদ, ভোগবাদ আর আত্মকেন্দ্রিকতা। আর এসব কিছুকেই বাংলাদেশের তারুণ্য ধারণ করছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সরকার তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করছে না। যার ফলে তারা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে লেখাপড়া করতে আর দেশে না ফিরে সেখানেই থেকে যাচ্ছে ভালো সুবিধার জন্য। আর এরকমটা চলতে থাকলে বাংলাদেশ একদিন মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করা যায়। তাই বেকার তরুণদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দক্ষ করে গড়ে দেশের সম্পদে পরিণত করতে হবে। নাহলে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ।
