হিরু তখন কলেজে পড়ে। তাদের পাড়ায় মিষ্টি নামে এক মেয়ে থাকত। ডিগ্রি কলেজে পড়ত সে। সবাই তাকে মিষ্টি আপু নামেই ডাকত। অবশ্য সিনিয়রদের কথা আলাদা। একই সঙ্গে হিরুর কথাও আলাদা ভাবে বলা যায়। হিরু তাকে আপু বা আপনি সম্বোধন করত না। প্রথম যেদিন হিরু মিষ্টিকে আপু না ডেকে তুমি বলে সম্বোধন করল, অন্যদের ‘মিষ্টি আপু’ তখন ভীষণ চটে গেল।
‘এই ছেলে!’
‘জি।’
‘এটা কী হলো?’
‘কী হলো? ঘোড়ার ডিম থেকে বাচ্চা নাকি হাতির পেটে কুমির?’
‘ফাজলামো বাদ দাও। তুমি আমাকে আপু না ডেকে তুমি তুমি করছ কেন?’
‘তুমি আমাকে ‘তুমি’ করছ কেন?’
মেয়েটি টাসকি খেল। ‘এ আবার কেমনতর কথা? ছোটদের তো তুমি করেই বলি আমি।’
‘যারা আমার কাছের অর্থাত্ আপনজন, তাদেরকে আমি তুমি করে বলি। সে ছোট হোক বা বড়!’ হিরুর জবাব।
তারপর থেকেই অন্যদের মিষ্টি আপু হিরুর বন্ধু হয়ে গেল। অন্যরা ধরেই নিল—হিরু বুঝি সিনিয়রের ওপর ক্রাশ খেয়েছে কিংবা সিনিয়র খেয়েছে তার ওপর! কেউ কেউ তা আফসোসই করল, ‘মিষ্টি আপু ছোটদের প্রতি এভাবে আকৃষ্ট হবেন জানলে, আমরাও চেষ্টা করে দেখতাম!’ অন্যদিকে, মিষ্টির যত পাণিপ্রার্থী ছিল, তারা একে একে সরে গেল। ‘যে মেয়ে নিজের থেকে ছোট ছেলের সাথে প্রেম করে, তার সাথে আমরা বড়রা কী প্রেম করব! তার পিছু ঘুরলেও তো বদনামি হবে শেষে!’ আরেকদল ভাবল, ‘হিরুর নিশ্চয়ই বয়স হয়েছে! দেরি করে স্কুলে ভর্তি হয়েছে, কিংবা কোনো ক্লাসে ডাব্বা মেরেছে! নচেত্ সিনিয়রের প্রতি কীভাবে আকৃষ্ট হয়!’
অথচ মিষ্টি ও হিরুর মধ্যে কোনো রসায়নই তৈরি হয়নি। ব্যাপারটা তাদের দুজনের ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলল। জুনিয়র হিরুকে দিয়ে আগে পাড়ার বড়ভাইয়েরা মিষ্টির কাছে চিঠি-উপহার পাঠাত। বিনিময়ে হিরু পেত চকোলেট, নগদ অর্থ! অন্যদিকে, পাড়ার সবগুলো জোয়ান ছেলে পিছু পিছু ঘুরঘুর করায় মিষ্টি মনে মনে অন্য ধরনের পুলক অনুভব করত। এখন এসবের কিছুই হচ্ছে না। না লাভ হচ্ছে হিরুর, না মিষ্টির! দুজনই ভাবল—এর একটা আশু সমাধান প্রয়োজন!
মুশকিল খুব দ্রুতই আছান হলো। রেস থেকে হিরুর পাড়ার দাদারা সরে গেলেও, একজন সরল না। তার নাম তরুণ। সে সম্পর্কে হিরুর চাচা হয়। নানা কায়দা করে সে জেনেছে—হিরু আর মিষ্টির মধ্যে কোনো কেমিস্ট্রি চলছে না! ফিজিক্স, বায়োলজি তো দূরের কথা। পুরোটাই ভোগাস।
একদিন সে হিরুতে ডেকে খুব করে খাওয়াল। খাওয়া শেষে হিরু দিল দৌড়! তরুণ হিরুর এমন কাণ্ডে অবাক। সেও হিরুর পিছু পিছু ছুটল। হিরু ঘরে গিয়ে কোথায় যে হারাল! তরুণ হিরুদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
আধাঘণ্টা পর হিরুর দেখা মিলল। সে বলল, ‘স্যরি ভাই। অনেকদিন পেটে ভালো কিছু পড়েনি। আজ হঠাত্ পড়ায় পেটে ডিস্টার্ব শুরু হলো। তাই আর বাথরুমের টান উপেক্ষা করতে পারিনি।’
তরুণ কী বলবে ভেবে পেল না। সে মুচকি হাসি দিয়ে নিজের কাজের প্রসঙ্গ তুলল। হিরুর হাতে চিঠি আর গোলাপ তুলে দিল। আর হিরুর পকেটে গুঁজে দিল এক তাড়া টাকা।
হিরু সেগুলো নিয়ে সোজা মিষ্টির সামনে হাজির হলো। মিষ্টি ভাবল, হিরু আবার তাকে প্রপোজ করবে না তো!
পুরো ব্যাপারটা খুলে বলার পরে, মিষ্টিকে দারুণ উচ্ছ্বাসিত দেখাল। অনেকদিন বাদে তার মনের মতো একজনের খোঁজ পাওয়া গেল। তরুণকে সে দেখেছে। ভালোই। তাছাড়া হিরুও তাকে ‘ভালো’র সার্টিফিকেট দিয়েছে। অন্যদিকে, নামের মধ্যেও একটা স্মার্ট স্মার্ট ভাব আছে! চিরকাল যে সে তরুণই থাকবে!
সেদিন রাতে তরুণের সঙ্গে মিষ্টির কথাবার্তা অনেকদূর এগোয়। পরদিন দুজনে দেখা করে। একদিন মিষ্টির বাবার সঙ্গে তরুণের আলাপও হয়।
তার ক’দিন পর হিরুর সঙ্গে মিষ্টির দেখা হয়। হিরু জানতে চাইল, ‘কেমন চলছে, আন্টি?’
মিষ্টি চমকে ওঠে। আন্টি! হিরু তাকে আপু ডাকেনি, অথচ এখন আন্টিতে চলে গেছে! মাথা গেছে নাকি!
মিষ্টির মিষ্টি চেহারায় আগুন ধরে গেল। সে বলল, ‘হিরু, এসব কী বলছ?’
‘কী বলেছি, আন্টি?’
‘আবারও!’ মিষ্টির মেজাজ সপ্তম আসমানে চড়ে। ‘তুমি আমাকে আন্টি ডাকছ কেন? যেখানে তোমার মুখে এখন আপু ডাক শুনতেই খারাপ লাগে আমার, সেখানে আন্টি!’
‘আপনাকে যেই সম্বোধন করা উচিত, সেটাই করছি।’
‘মানে!’
‘মানেটা খুবই সহজ। আপনি তো তরুণ আঙ্কেলকে বিয়ে করতে চাইছেন। তরুণ আঙ্কেল ঘরজামাই হতে চলেছেন...।’
‘তো? তুমি কি এই সম্বন্ধে রাজি নও?’
‘আমি রাজি হব না কেন? আমিই তো ঘটকালি... না কিছু না। বলছিলাম কী, আমি তো খুব করেই চাই—এই বিয়ে হোক। তরুণ আঙ্কেল সারাক্ষণ আপনার সাথে থাকুক। সে কারণেই তো সম্বোধন চেঞ্জ করে ফেলেছি!’
‘তরুণকে বিয়ে করলে তোমার আমাকে সম্বোধনের পরিবর্তনের কী দরকার?’
‘আরে!’ হিরু এবার বিরক্ত হলো। ‘তরুণ আঙ্কেলের বউ সম্বন্ধে আমার কী হবেন? আন্টিই তো হবেন, নাকি?’
মিষ্টি থ মেরে যায়। তার মিষ্টি চেহারায় এখন কোনো মিষ্টতা নেই। আছে হতাশা। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘ডিসমিস!’
‘কী হলো?’ হিরু জানতে চাইল।
‘না, এই বিয়ে আমি করব না।’
‘কেন?’
‘আমি এত্ত তাড়াতাড়ি কারও চাচি-মামি হতে রাজি নই! এই বিয়ে আমি করব না। তরুণকে জানিয়ে দিচ্ছি।’
হিরু পড়ে গেল গত্যান্তরে। সব শুনলে হিরুর তরুণ আঙ্কেল তার ওপর হেভি ক্ষেপা ক্ষেপবে! মিষ্টিকে ঠাণ্ডা করতে সে বলল, ‘কিন্তু আন্টি, ক’দিন পর তো আপনাকে আন্টিই হতে হবে।’
মিষ্টি ব্যাপারটা মানতে পারল না। তখনই সে তরুণকে ফোনে জানাল বিষয়টা। মিষ্টির কথা শুনে এবার তরুণের মন চোর চোর করতে লাগল। সে হিসেব করে দেখল—ব্যাপারটা সত্য! তার বড় ভাই-বোনদের এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে আছে। মিষ্টিকে তো তারা সারাক্ষণ চাচি-মামি বলেই ডাকবে!
সে বলল, ‘কিন্তু আমি তো ঘরজামাই হিসেবেই থাকব। আমার ভাতিজা-ভাগিনিরা ডাকার জন্য তোমাকে পাবে কই?’
মিষ্টিও হিসেব করে দেখল—তরুণকে বিয়ে করা মাত্রই সে অটো চাচি-মামি হয়ে যাচ্ছে। তাহলে তো হবেই না! তরুণকে সে চূড়ান্ত কথাটা বলে ফেলল, ‘বিয়ে তো দূরের কথা, প্রেমও ডিসমিস।’
তরুণের সঙ্গে কথা শেষে সে মুচকি হেসে হিরুকে বলল, ‘হিরু, তোমার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী?’
‘কোন বিষয়ে?’
‘এই ধরো, বিয়ের ক্ষেত্রে! ধরো কেউ তোমাকে যদি ঘরজামাই হওয়ার অফার করে তুমি কি রাজি হবে!’
হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা। আম্মু বলেছে—এটা নিয়েই চিন্তা-ভাবনা করতে। এর বেশি-কিছু না।’
২.
এরপরে হিরুর জীবনে অনেকগুলো বসন্ত কেটে গেছে। অনেকেই এসেছে তার জীবনে। কিন্তু নানা কারণেই প্রেমিকা হয়ে উঠতে পারেনি কেউ! এরমধ্যে একজনের কথা ভিন্ন—মৌ। সে হিরুর ছোটকুর শ্যালিকা। সম্বন্ধে সে হিরুর আন্টি হয়। হিরুর বাবা-মা তার বেয়াই-বেয়ান হলেও, তাদেরকে শ্বশুর-শাশুড়ি ডাকতে রাজি সে। তাতে যদি তারা রাজি না হয়, তাহলে বিয়ের পরেও সেই আগের সম্বন্ধ, মানে বেয়াই-বেয়ান ডাকতেও আপত্তি নেই তার। এমনকি, হিরুর মামিকে (নিজের বোনকে) সে মামি ডাকতেও রাজি! হিরুর তখন মিষ্টির কথা মনে পড়ল। একজন আন্টি হতে চায়নি বলে বিয়ে ভেঙে দিল! আরেকজন তার আন্টি হয়েও বউ হতে চাইছে! কী মুছিবত!
৩.
সেদিন মেসে হিরুরা সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। মেসের অন্যতম সদস্য মামুন মলিন বদনে এসে বলল, ‘হায়রে প্রেম!’
‘কী হলো?’
‘জানোই তো সামনে চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি। ভালোবাসা দিবস। তো গার্লফ্রেন্ড বললাম ওইদিন আমার সাথে দেখা করো।’
‘বেশ তো, ভালো কথা।’
‘গার্লফ্রেন্ড জানালো, তার সবগুলো ড্রেস আগে পরা হয়ে গেছে! ভ্যালেন্টাইনসের দিন দেখা করার জন্য নতুন কোনো পোশাক নাই! কিনে দাও।’
‘দিয়েছ কিনে?’ হিরু জানতে চাইল।
মামুন বলল, ‘আর বলবেন না—একটা পোশাক কিনতে বারো জায়গায় যেতে হলো। হেঁটেছি চার কিলোমিটার। সময় লেগেছে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা।’
‘ভালো তো, ভালো না।’
মামুন আফসোসের সুরে বলল, ‘হুমম... ভালোই। বাজেট ছিল হাজার দুয়েকের মধ্যে কিনে দেব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গেল সাড়ে চার। ডাবলেরও বেশি!’
হিরুরা মেসে সর্বোমোট সাতজন। চারজনই মামুনের দলের লোক, অর্থাত্ মিঙ্গেল। ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে তাদের জোর প্রস্তুতি চলছে। হিরুর দলে সে বাদে আর মাত্র দুজন। মামুনের কথা শুনে তারা তিনজন হাই-ফাইভ করল। তারা হিসেব করে দেখল—আজ গার্লফ্রেন্ড নেই বলে তাদের তিনজনের সম্মিলিতভাবে সর্বোমোট সাড়ে তের হাজার টাকা সেভ হয়েছে!
তথ্যটা হিরু অন্যদের জানাতে তারা বলল, ‘তাহলে ওই টাকার কিয়দংশ দিয়ে একটা পার্টি হোক!’
হিরু উল্টো বলল, ‘যারা গার্লফ্রেন্ডের পিছনে একদিনে সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করে আসে, তারা ট্রিট না দিলে কথাই নাই।’
‘আমরা তো কেউ না, তাই গার্লফ্রেন্ডের মতো ট্রিট পাই না!’ হিরুর পক্ষাবলম্বনকারী আরেকজন বলল।
বাধ্য হয়ে মামুন ও তার মতো মিঙ্গেলরা চৌদ্দ ফেব্রুয়ারির আগেই হিরুদের ট্রিট দেবে বলে আশ্বাস দিল।
কতক্ষণ পর হিরু খেয়াল করল—মামুন একা একা বাদাম খাচ্ছে। মামুনকে সে কখনো বাদাম খেতে দেখেনি, তাই বলল, ‘বাদাম কোথায় পেলে, মামুন?’
‘এই আসার সময় দশ টাকার কিনে আনলাম...।’
হিরুকে অবাক করে দিয়ে মামুন একা একাই সবগুলো বাদাম খেলো। ওদের বাকি ছয়জনকে দু পিস না করে হোক, এক পিস করেও তো দিতে পারত!
‘এর কারণ ঠিক কী হতে পারে?’ হিরু ভাবল। কতক্ষণ পর তার হিসেব মিলল—মামুন গার্লফ্রেন্ডকে এত্তগুলো টাকা দিয়ে উপহার দেওয়ার বিনিময়ে তার গার্লফ্রেন্ড তার হাতে দশ টাকার বাদাম ধরিয়ে দিয়েছে!
ব্যাপারটা মামুনও স্বীকার করল। এতক্ষণ সে এই দশ টাকার বাদামকে সাড়ে চার হাজার টাকার বলে মনে করে একা একাই খেয়েছে। টাকাটা জলে যেতে দেয়নি!
হিরু জানতে চাইল, ‘আচ্ছা মামুন, তোমার গার্লফ্রেন্ড কি আজ নতুন ড্রেস পরেই এসেছিল? মানে, আজ সে যেই পোশাক পরে এসেছে, সেটা কি আগে কখনো পরেনি?’
‘না। এটা নতুনই ছিল।’
‘তাহলে চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি এটা পরে আসতে বললেই তো পারতে!’
মামুন এবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। সে বলল, ‘ভাই, আপনে এই কথাটা আগে বললে আজ আমার এত্তগুলা টাকা বেঁচে যেত। সেই টাকা দিয়ে আসছে চৌদ্দ তারিখে ডেটিং খরচ চালাতে পারতাম। এখন আবার টাকা ধার করতে হবে...’
৪.
কিছুক্ষণ পর কুরিয়ারের লোক এসে হিরুর হাতে একটা পার্সেল ধরিয়ে দিল। ভেতরে নানা ধরনের উপহার সামগ্রী। শার্ট-প্যান্ট-বেল্ট, মানিব্যাগ, বই, গোলাপফুল, লাভ চকোলেট, আরও কত কী...
‘কে পাঠিয়েছে এসব?’ মেসমেটরা জানতে চাইল।
প্রশ্নটা হিরুরও। কে পাঠিয়েছে এসব? খামে কারোর নাম নেই। নেই কোনো চিঠি।
‘হিরু ভাই, বলেন না কে পাঠিয়েছেন?’ তারা আবারও জানতে চাইল। ‘আপনিও যে প্রেম করেন—এ কথা বলেননি কখনো। এবার ধরা খেয়ে গেলেন। নিশ্চয়ই এ আপনার গার্লফ্রেন্ডের কাজ!’
হিরু বিড়বিড় করে বলল, ‘কে পাঠালো...’
‘তার মানে আপনার গার্লফ্রেন্ড একজন নয়, দুই-তিন জন কিংবা অসংখ্য, তাই না? সে কারণেই ঠিকঠাক হিসাব মেলাতে পারছেন না!’
হিরুর মেসমেটরা ধরেই নিয়েছে—হিরু বিশ্বপ্রেমিক। অনেকগুলো প্রেম করে বেড়ায় সে। সেদিনের পর থেকে তাই প্রেম না করেও রহস্যজনকভাবে হিরুর কপালে অনেকগুলো প্রেমিকা জুটে গেল! g
