পত্রবাহক

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:১৭

  সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

 

এক.

‘বাবা, তোমার জন্য রোয়াইল বাজার থেকে চকলেট কিনে এনেছি। তোমার পছন্দের ছড়া টেপ রেকর্ডারে ধারণ করব। শুধু আমার একটা ছোট কাজ করে দিতে হবে।’

‘আমি করে দেব কাকা। আপনি বলেন কী করতে হবে?’ ক্লাস ফাইভে পড়া শিক্ষার্থী হিসেবে এত কিছু চিন্তা করার মতো বুদ্ধি তখন আমার ছিল না।

রাজন কাকা খুশি হয়ে আমার হাতে বেশ কয়েকটা চকলেট দিলেন।

তারপর টেপ রেকর্ডার অন করে বললেন, ‘ছড়া বল।’

কবি জসিমউদ্দীনের ‘মামার বাড়ি’ ছড়াটা আমি এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম।

কাকা সেটা ধারণ করে আমাকে তা আবার শোনালেন। আমি খুশিতে আত্মহারা।

কাকা আমার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললেন, ‘বেলাল ভাইয়ের বিয়েতে আমি যাচ্ছি না। তুমি যাওয়ার সময় এই চিঠিটা সাথে নিয়ে যাবে। ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির পাশেই আমার মামার বাড়ি। তুমি চিঠিটা আমার মামাতো বোন অনামিকাকে দিবে।’

আমি চিঠি হাতে নিলাম।

কাকা বললেন, ‘চিঠিটা গোপনীয়। সাবধানে পৌঁছাতে হবে। আর অনামিকা কোনো চিঠি দিলে তাও সাবধানে নিয়ে আসবে। তোমার জন্য আমি আরও গিফট কিনে রাখব।’

‘ঠিক আছে কাকা’ বলে আমি চিঠি নিয়ে রাজন কাকার রুম থেকে আমাদের বাড়িতে চলে এলাম।

 

দুই.

কাকার বিয়ে উপলক্ষে সবাই অনেক কেনাকাটা করল। আমার জন্য কেনা হলো একটা ফুল প্যান্ট। এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম ফুল প্যান্ট। বিয়ের দিন সকালে ওই প্যান্ট পরে রেডি হলাম। বড়রা প্যান্টের নিচে কী যেন পড়ছেন দেখে আমিও ফুল প্যান্টের নিচে একটা ইংলিশ প্যান্ট পরলাম। তারপর নতুন প্যান্টের পকেটে নিলাম রাজন কাকার চিঠি। আমরা দুপুরের দিকে বিয়ে বাড়িতে পৌঁছালাম। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকালে কাকার বড় শালা সোহাগ মামা বললেন, ‘ভাগিনা চল ঘুরে আসি।’

আমি রাজি হয়ে গেলাম। মামা আমাকে একটা স্কুুলের মাঠে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমার বয়সী ছেলেরা হাডুডু খেলছিল।

মামা বললেন, ‘তুমি খেলবে নাকি?’

আমি সম্মতি জানালাম।

খেলতে গিয়ে প্রথমেই বিড়ম্বনায় পড়লাম ফুল প্যান্ট নিয়ে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গেলেই তারা আমার পা রেখে প্যান্টের পা ধরে টানাটানি শুরু করে। একবার টানাটানিতে ফুল প্যান্ট রেখেই নিজেদের সীমানায় চলে এলাম। নিচে ইংলিশ প্যান্ট থাকায় লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরতে হয়নি।

মামা বললেন, প্যান্টটা আমার কাছে দিয়ে যাও।

আমি মামার কাছে প্যান্ট দিয়ে ইংলিশ প্যান্ট পরেই খেলতে নামলাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলাধুলা করে মামার সাথে বাসায় ফিরলাম।

রাতে খাওয়ার পর সোহাস মামা আমার রুমে এসে বললেন, ‘ভাগিনা, এই বয়সেই প্রেমপত্র নিয়ে ঘুরাঘুরি কর! ব্যাপার কী?’

আমার কলিজা কেঁপে উঠল। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখি চিঠি নেই। ভয়ে মামা ডাকের পরিবর্তে আমার মুখ দিয়ে ম্যা ম্যা আওয়াজ বের হচ্ছিল।

মামা চিঠিটা বের করে দেখিয়ে বললেন, ‘এটা কার চিঠি?’

আবারও ম্যা ম্যা শব্দ ছাড়া আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।

মামা বললেন, ‘খেলার সময় আমি এটা মাঠে কুড়িয়ে পেয়েছি। বাড়িতে আসার পর সবাই মজা নিয়ে চিঠিটা পড়েছি। চিঠিতে পত্রবাহক হিসেবে তোমার নাম লেখা আছে।’

ভয়ে আমার হাঁটু কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে।

মামা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘ভয়ের কিছু নাই। আমি সবাইকে ম্যানেজ করেছি।’

আতঙ্কে ওই রাতে আমার এক ঘণ্টাও ঘুম হয়নি।

 

তিন.

পরদিন সকালে সবাই মিলে রাজন কাকার মামার বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। কাকার মামাতো বোন অনামিকা আমাকে দেখেই তার রুমে নিয়ে গেলেন। অনামিকা আন্টি বললেন, ‘তোমার কাকার একটা চিঠি দেওয়ার কথা ছিল। কোথায় সেটা?’

আমি বুদ্ধি করে বললাম, ‘কাকা আপনার ওপর রাগ করেছেন। বলেছে আপনি আগে চিঠি না দিলে উনি দিবেন না।’

অনামিকা আন্টি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তুমি যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা করে যাবে। এই নাও চকলেট। এই কথা কারও কাছে বলবে না।’

—ঠিক আছে আন্টি।

ওখান থেকে আসার আগে অনামিকা আন্টি আমার প্যান্টের পকেটে একটা চিঠি গুঁজে দিলেন। সাথে দিলেন আরও কিছু চকলেট।

বেলাল কাকার শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছেই আমি সরাসরি বাথরুমে দৌড় দিলাম। মুহূর্তের মধ্যে চিঠি খুলে পড়া শুরু করলাম। চিঠি পড়ে যা বুঝলাম, কাকার চিঠি না পেয়ে উনি বেশ ক্ষেপেছেন। এই চিঠি রাজন কাকার হাতে গেলে আমার বিপদ আছে ভেবে তা কুচি কুচি করে বাথরুমে ফেলে দিলাম।

তাড়াহুড়া করে টয়লেটে ঢুকা এবং বেশি সময় অবস্থান করায় বেলাল কাকা জানতে চাইলেন, পেটে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না?

আমি বললাম, ‘পোলাও খেয়েছি তো কাকা। তাই একটু...’

কাকা নতুন কাকি বললেন স্যালাইন বানিয়ে দিতে।

আমি ভয়ে কিছু বলিনি।

তারপর সুস্থ শরীরেই নতুন কাকির হাতে বানানো গুড় আর লবণের কয়েক গ্লাস স্যালাইন খেলাম।

 

চার.

নতুন কাকিকে নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। রাজন কাকার ভয়ে বাড়িতে এসে আমি ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে রাজন কাকার ডাকে ঘুম ভাঙল।

কাকা বললেন, ‘চলো আমার রুমে।’

আমি কাকার রুমে যেতেই তিনি দরজা লাগিয়ে আমার মুখোমুখি বসে বললেন, তুই চিঠি কার কাছে দিয়েছিস। রাতে বড় ভাই, মেজো ভাই সবাই আমাকে ডেকে নিয়ে ইচ্ছেমতো গালাগাল করেছে।

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘কাকা আমি চিঠি হারিয়ে ফেলেছিলাম।’

‘চুপ থাক। দুই মাইল হেঁটে চকলেট এনে তোকে খাওয়ালাম। তুই আমার ইজ্জত লাটে তুলছিস।’ বলেই কাকা আমার গালে কয়েকটা চড় কষিয়ে দিলেন।

আমি হাউমাউ করে কান্না শুরু করলাম। কাকা সেই কান্না রেকর্ড করলেন। আমার কান্না থামার পর তিনি টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা কান্না ছেড়ে বললেন, ‘চিঠির কথা যদি আর কাউকে বলিস তাহলে তোর এই ভেউ ভেউ কান্না মাইকে বাজাব। এখন তুই চলে যা।’

আমি চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। ওই দিনই থেকে প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবনে কারও প্রেমপত্রের বাহক হবো না। নিজে প্রেম করলেও কাউকে পত্রবাহক বানাব না।