জামাতা ও ঘটকই পরিকল্পনাকারী

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২২:৪৮

ছিল পারিবারিক দ্বন্দ্ব। মেয়ের মা ঘনঘন মেয়ের শ্বশুর বাড়ি এসে মেয়ে ও মেয়ের স্বামীর মধ্যের দাম্পত্য কলহ দূরের চেষ্টা চালাতেন। এতে বিরক্ত ছিল মেয়ের স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন। তাই শাশুড়িকে একটা ‘শিক্ষা’ দিতে ঘটকের সাহায্য নেন জামাতা। এরা দুইজন পরিকল্পনা করে এক বাস চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চালককে বলা হয়েছিল ভয় দেখাতে, যাতে শাশুড়ি আর কোন দিন আশুলিয়া না আসে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা থেকে সরে গিয়ে বাস চালক ও তার সহযোগীরা বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে শাশুড়ির বাবাকে। পিটিয়ে মেরে ফেলে শাশুড়িকে।

সমপ্রতি রাজধানীর পাশে আশুলিয়ায় চলন্ত বাস থেকে বাবাকে ফেলে দিয়ে মেয়েকে হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পারে। তদন্তে বেরিয়ে আসে এই ‘শিক্ষা’ দেয়ার জন্য বাস চালককে দশ হাজার টাকা দেয়া হয়। এ ঘটনায় নিহত জরিনার মেয়ে রোজিনার স্বামী নূর ইসলাম, নূর ইসলামের মা আমেনা বেগম ও বিয়ের ঘটক স্বপনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে বাস চালক, হেলপার ও তাদের দুই সহযোগী পলাতক রয়েছে।

গত ৯ নভেম্বর শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়ার মরাগাঙ এলাকার রাস্তার পাশ থেকে জরিনার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরিকল্পনাকারী জামাতা নূর ইসলামই শাশুড়ি হত্যার ঘটনায় বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

গতকাল শনিবার ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঘটনার দিন ৯ নভেম্বর দুপুরে জরিনা খাতুন, তার বাবা আকবর আলী মন্ডল ও ঘটক স্বপন সিরাজগঞ্জের চৌহালী থেকে নূর ইসলামের বাড়ি আশুলিয়ার মুন্সিপাড়া যান। বাড়ি আসার আগেই নূর ইসলাম ঘটক স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করে তারা। সে অনুযায়ী স্বপন পল্লবী এলাকার বাস চালক সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিদ্ধান্ত হয় সালাম মিনিবাস নিয়ে আশুলিয়া আসবে। টাঙ্গাইল নিয়ে যাওয়ার কথা বলে জরিনা ও আকবর যাত্রী হিসাবে ওই বাসে উঠবে। এরপর তাদেরকে এমন মারধর দেয়া হবে যাতে আশুলিয়ায় মেয়ের বাসায় আসতে সাহস না পায়। এজন্য বাস চালককে দেয়া হয় দশ হাজার টাকা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ওইদিন খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিকাল ৫টার দিকে জরিনা খাতুন ও তার বাবা আকবর সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। জামাই নূর ইসলাম তাদেরকে টাঙ্গাইলগামী সালামের মিনিবাসে তুলে দেন। সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, পারিবারিক কলহের জের ধরে বাসে তুলে জরিনা খাতুনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য বাস চালকের সঙ্গে ১০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল স্বপনের। বাসটি আটক করা হয়েছে। তবে চালক-হেলপারসহ চারজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জরিনাকে হত্যার ধরন সম্পর্কে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মারধরের পর শ্বাসরোধ করে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। গ্রেফতারের পর নূর ইসলাম দাবি করেছেন, চালকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল তার শাশুড়িকে ভয় দেখাতে। প্রয়োজনে মারধর করতে। কিন্তু তারা যে মেরে ফেলবে তা তিনি জানতেন না।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাস মালিক নাজমুল হাসান তোরাব। তিনি বলেন, চালক সালাম ঘটনা ঘটিয়ে বাস ফেলে পালিয়ে যায়। চালকের মা তার কাছে মোবাইল ফোনে ঘটনা জানিয়ে তাকেও পালাতে বলেছিলেন। এরপরই তিনি বাসের খোঁজ শুরু করেন। ঘটনার পরের দিন সরকার মার্কেট এলাকায় বাসটি পান। পরে পুরো ঘটনাটি পুলিশকে জানান তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক শাহজাহান ভূইয়া জানান, গ্রেফতার তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেছেন। পলাতকদের বিষয়ে তথ্য জানতে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রবিবার আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে।