ফারহানা ইয়াসমিন
অনেক কবিই নারীর সৌন্দর্যের প্রকাশের সময় চুলের বন্দনা করেছেন। ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’। প্রিয়ার সৌন্দর্য বন্দনা করতে গিয়ে মাথার চুলকে নেহাতই বাদ দেননি কবি জীবনানন্দ দাশ। নারীর সৌন্দর্যের অপার রহস্যের বেশ অনেকটাই লুকিয়ে থাকে চুলের মধ্যে। কিন্তু এই কর্মব্যস্ততার জীবন নারীর রূপচর্চার সময় অনেকখানি কেড়ে নিয়েছে। সৌন্দর্য পিপাসু নারীরা আগের মতো ঘরে বসে চুলের যত্ন নেওয়ার সময় পান না। এমন সমস্যা দূর করার জন্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাত ফাতেমা ঘরোয়া পদ্ধতিতে আমলকী তেল নিয়ে এসেছেন। শুরু করেছেন অনলাইন ব্যবসা। এতে তার ব্যবসা যেমন চলছে, তেমনি নিজের একটি পরিচয়ও মিলেছে।
মূলত ২০২০ সালের ১৭ মার্চে সরকার কর্তৃক ঘোষিত ছুটির পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে বাসায় চলে আসেন। এরপর দীর্ঘদিন বাসায় থাকতে থাকতে হতাশ হয়ে পড়েন। এভাবে বসে থেকে না পড়াশোনা হচ্ছে, না কোনো কাজে মন দিতে পারছেন। ঐ সময়টাতে ফাতেমা নিজেকে নিজের কাছে একটা বোঝা মনে করতে শুরু করলেন। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এবং আত্মপরিচয় তৈরি করার জন্য বড় বোনের পরামর্শে অনলাইন ব্যবসার কথা মাথায় আসে। শুরুতে কোন জিনিস নিয়ে অনলাইন ব্যবসাটা শুরু করবে এটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যান ফাতেমা। এরপর তাদের মাথায় এলো আমলকীর তেলের কথা। কেন না, এর আগেও তারা এরকম ঘরোয়া পদ্ধতিতে আমলকীর তেল তৈরি করে ব্যবহার করত।
ফাতেমার ছোট ভাই তাদের আর্থিক সাপোর্ট দিয়ে এই ব্যবসা করার জন্য উত্সাহ দিলে সে একটি অনলাইন পেজ খুলেন। যার নাম হলো ন্যাচারাল আমলা হেয়ার ওয়েল। বর্তমান পেজের সদস্য সংখ্যা হাজারের বেশি। ৯ মাস হলো তাদের ব্যবসার বয়স। এই ৯ মাসে তাদের ছোট্ট ব্যবসা থেকে বেশ মুনাফাও এসেছে। ফাতেমার বড় বোন ও ছোট ভাই ছিল তার এই অনলাইন যাত্রা পথের সঙ্গী ও উত্সাহদাতা। প্রথম দিকে ফাতেমার বাবা-মা বিষয়টি নিয়ে মন ক্ষুণ্ন ছিল। এখন যদি তাদের মেয়েকে বিয়ের জন্য ছেলে পক্ষ দেখতে এসে যদি শোনে মেয়ে অনলাইন ব্যবসা করে তাহলে মানসম্মান নষ্ট হয়ে যাবে। ফাতেমা ও তার বড় বোন পিতা-মাতার এরকম মনোভাবকে জয় করে নিয়েছেন ইতিমধ্যে তাদের নিজ হাতে তৈরি করা আমলকী তেল নিয়ে ব্যবসার মাধ্যমে।
নারিকেল, আমলকী, অ্যালোবেরা, মেথিসহ আরো নানান রকমের প্রাকৃতিক উপাদানের মিশ্রণের মাধ্যমে তারা এই তেল তৈরি করেন। ফাতেমা পড়াশোনা করেন বরিশালে কিন্তু তার বাসা খুলনাতে। কিন্তু তার পণ্যটি বেশি বিক্রয় হয় বরিশালে। তিনি এমনটা জানিয়েছেন, তার বিভাগের শিক্ষিকারাও এই তেল ব্যবহার করছেন। শিক্ষিকাসহ সব ক্রেতারাই অনেক ভালো রিভিউ দিয়েছেন।
সম্পূর্ণ ঘরোয়া পদ্ধতিতে এই তেল তৈরি করা হয় এবং এই তেলের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। চুল মজবুত ও ঘন কালো করাই হলো এই তেলের বিশেষ গুণ। এই অনলাইন ব্যবসা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ুক এমনটা ফাতেমার ইচ্ছা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলে ফাতেমাকে আবারও পড়াশোনার জগতে ফিরতে হবে। তখন এই ব্যবসা চালিয়ে নেওয়ার জন্য লোক লাগবে। সেজন্য, ফাতেমা চায় এই ছোট ব্যবসা দিয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে এবং আর পাঁচটা মেয়েকে স্বাবলম্বী করতে। বর্তমানের প্রতিযোগিতা পূর্ণ পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রত্যেকের উচিত নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। সেই প্রত্যাশা নিয়ে ফাতেমা গৃহবন্দি জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় আছেন।
