সিরিয়ার দারায় রুশ মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২১

এম এ আলআমিন

 

কয়েক সপ্তাহের লড়াইয়ের পর সিরিয়ার দারা শহরে রুশ মধ্যস্থতায় তিন দিনের অস্ত্র বিরতি হয়েছে। সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী সূত্র এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। গত সপ্তাহে অস্ত্র বিরতির ঘোষণা আসার পর রুশ সামরিক কর্মকর্তারা অস্ত্র বিরতি পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা প্রদেশের দারা আল বালাদ শহরটি শাসক বাশার আল আসাদের বিদ্রোহীদের একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

সিরিয়ায় আসাদকে হটানোর লক্ষ্যে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ১০ বছরেও শেষ হয়নি। পরিস্থিতি যদিও আসাদ বাহিনীর অনুকূলে, কিন্তু বিদ্রোহীরা এখনই হাল ছেড়ে দিতে নারাজ। দেশটির বিভিন্ন অংশ এখন বাইরের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তারা রুশ প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি আছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ার ঘাঁটি ছেড়ে দেবে এবং সেখানে সিরিয়া ও রাশিয়ার পতাকা ওড়ানো হবে। প্রদেশটি বিদ্রোহীদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল। ২০১৮ সালে সরকারী বাহিনী এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে পুরো প্রদেশ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি,  গুরুত্বপূর্ণ শহর দারা আল বালাদের বাসিন্দারা আসাদ বাহিনীর বশ্যতা স্বীকার করেনি। বিদ্রোহীদের বাগে আনতেই ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের সহযোগিতা নিয়ে সরকারি বাহিনী দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় ছিটমহলটিতে অভিযান শুরু করে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকারি বাহিনী যেমন ইরানি মিলিশিয়াদের সহায়তা পাচ্ছে, ছিটমহলের বিদ্রোহীরাও আরেকটি ইরানি গ্রুপের সহযোগিতা পাচ্ছে।

দারা আল বালাদ থেকেই আসাদ পরিবারের চার দশকের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। আরব বসন্তে অনুপ্রাণিত ২০১১ সালের মার্চে সেখানে প্রথম বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর সরকারি বাহিনী কঠোর হাতে সেই আন্দোলন দমন শুরু করলে তা ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। দারার নিকটবর্তী দায়েল, জাসেম ও আরো কয়েকটি শহরের চেকপোস্টগুলোতে বিদ্রোহীরা হঠাত্ আক্রমণ বাড়িয়ে দেওয়ার পর সরকারি বাহিনীর সর্বশেষ অভিযানটি শুরু হয়। পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে দুইপক্ষের হানাহানির মধ্যে পড়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে বেসামরিক লোকজন। নতুন শরণার্থী যেন আসে সেজন্য সীমান্তে জর্দানের নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সিরিয়া সরকারি বাহিনী বলেছে, বিদ্রোহীদের আকস্মিক হামলায় তাদের চার জন সৈন্য নিহত হয়েছে। দারা আল বালাদের অবরুদ্ধ এলাকায় বেসামরিক মানুষ যেন জরুরি মানবিক সহায়তা পেতে পারে, সে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আসাদ সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে সেখানে ২০ হাজারের মতো মানুষ চরম মানবিক সংকটে রয়েছে।

আসাদ বাহিনী ২০১৮ সালে দারা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে নিশ্চয়তা দেয় যে প্রদেশটিকে তারা ইরানসমর্থিত মিলিশিয়াদের ঘাঁটিতে পরিণত হতে দেবে না। সর্বশেষ অস্ত্রবিরতি চুক্তি অনুযায়ী দারার পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীরা সরকারী বাহিনীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছে যদিও শহরের প্রশাসনিক ক্ষমতায় বিদ্রোহীদের হাতে রয়েছে। ২০১৮ সালের পর সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে এত তীব্র লড়াই আর হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়ায় ৩১ মে হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে সর্বশেষ এই সঙ্ঘাতের শুরু। কারণ দারার লোকজন ঐ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। প্রদেশটির সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ভোটাররা কেবল আসাদকেই ভোট দিয়েছে। দারা আল বালাদের মানুষ নির্বাচনের পর দিন সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। রাশিয়া আসাদ সরকারের মিত্র হলেও একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। রাশিয়া চায়না সীমান্তবর্তী অঞ্চলটিতে ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের শক্ত অবস্থান থাকুক। বহির্বিশ্বে আসাদ সরকারের মুষ্টিমেয় যে কয়টি মিত্র রয়েছে তার মধ্যে ইরান অন্যতম।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিবিষয়ক লেকচারার সামির বাকুর বলেন, ‘দারার অবস্থান কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। জায়গাটি জর্দান সীমান্তের কাছে। জর্দান ও ইসরাইলের মধ্যে গোলান মালভূমির সীমান্ত সেখান থেকে খুব দূরে নয়। গোলান মালভূমি নিয়ে জর্দান ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ার সেখানে কোনোভাবে ঢুকে পড়লে স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।’ তাছাড়া সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সেখানে সেনা উপস্থিতি কম। মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর জন্য এটি বাড়তি একটি সুযোগ। এ কারণে রাশিয়ার অনুরোধে আসাদের সৈন্যরা ২৫ জুন থেকে এলাকাটি অবরুদ্ধ করে রাখে। বাকুর বলছেন, কোনো এলাকা দিনের পর দিন অবরুদ্ধ রেখে মানবিক সংকট তৈরি করে বিদ্রোহীদের নত হতে বাধ্য করার কৌশল সিরিয়ায় নতুন কিছু নয়। আসাদ বাহিনী আগেও তা করেছে। বাকুর বলছেন, সর্বশেষ সৃষ্ট মানবিক সংকটের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা আসাদকে   নয়, বরং রাশিয়াকে দায়ী করছে। তবে অস্ত্রবিরতিটি যেহেতু রুশ মধ্যস্থতায় হয়েছে এবং বিদ্রোহীরা মেনে নিয়েছে আশা করা হচ্ছে, এবার পরিস্থিতির উন্নতি   ঘটতে পারে।