ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে চলিতেছে কীভাবে?

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৮

সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে বহু কারণ রহিয়াছে। চালক ও পথচারীর অসচেতনতা ও বেপরোয়া মনোভাবসহ সঠিক রোড ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইন-সিম্বলের অভাব এইসকল দুর্ঘটনার পিছনে বহুলাংশে দায়ী। চালকের অমানবিক আচরণের পাশাপাশি অদক্ষতা, প্রশিক্ষণের অভাব ও অল্প বয়সের কারণে চঞ্চলতাও কম দায়ী নহে। দায়ী গাড়ির দ্রুতগতিও। যেহেতু আমাদের দেশের সকল সড়ক-মহাসড়কে ফুটপাত নাই, নাই পর্যাপ্ত ফুটওভারব্রিজ, সেহেতু বিভিন্ন ব্রিজের কাছে ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে গাড়ি একটু ধীরে চালাইলে কী ক্ষতি! গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ইত্যাদি দেখিয়াও যদি গাড়ির গতি কমানো যায়, তাহা হইলে মানুষ দেখিয়া কেন গতি কমানো যাইবে না? ইহাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ হইল ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন।

সমপ্রতি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি যানবাহনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ফিটনেস জরিপ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করিয়াছে। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে এই জরিপ চালানো হইয়াছে। তাহাতে বলা হইয়াছে যে, ২৪ শতাংশ ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ফিটনেস সনদ নাই। বাসের ক্ষেত্রে এই হার একটু বেশি, ৩৩ শতাংশ। তন্মধ্যে ৫৬ শতাংশ বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তথা স্পিড গভর্নর সিল ছিল না। আর ট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে এই হার ৪১ শতাংশ।

মোট ৩৯টি বাস ও ৮৩টি ট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশার ওপর জরিপ চালাইয়া এই প্রতিবেদন তৈরি করা হইয়াছে। যেহেতু এই সংখ্যাটি খুবই নগণ্য, তাই অনেকে এই জরিপ হইতে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাইয়াছেন বলিয়া মনে করেন না। ইহা একটি দায়সারা গোছের জরিপ প্রতিবেদন বলিয়া তাহাদের অভিমত। তাহার পরও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের ব্যাপারে একটি ধারণা আমরা ইহা হইতে পাইতে পারি। এই প্রতিবেদনে ইহাও বলা হইয়াছে যে, ২৭ শতাংশ সিএনজির সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ। ইহার কারণে আমরা প্রায়শ দেখি, গাড়িতে থাকা সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হইতেছে। আবার গাড়ির সংকেত বাতির গুরুত্ব অনেক। কিন্তু ৩০ শতাংশ গাড়ির এই ধরনের বাতি নাই। ব্রেকলাইট নাই ২৯ শতাংশ যানবাহনের।  বাম্পার নাই ৯০ শতাংশের। ৯০ শতাংশের নাই অ্যাঙ্গেল। যানবাহনের এইসকল ত্রুটির কারণে যে কোনো সময় ঘটিতে পারে দুর্ঘটনা। এখন প্রশ্ন হইল, এইসব দেখার দায়িত্ব যাহাদের তাহারা কী করিতেছেন? ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এমনকি লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন সড়কে চলিতেছে কীভাবে?

এই প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হইয়াছে যে, এইসকল যানবাহনের ৮০ শতাংশ চেসিস, ৯৫ শতাংশ হেডলাইট, ৯৬ শতাংশ স্টিয়ারিং ও ৮০ শতাংশ স্পিডোমিটার ঠিক আছে। আবার শতভাগ যানবাহনের ব্রেক ও প্রায় সব ধরনের যানবাহনের দরজা-জানালা ভালো আছে। ইহা একটি আশাব্যঞ্জক দিক বটে। তবে সার্বিকভাবে যানবাহনের ফিটনেস প্রশ্নাতীত নহে। যানবাহনের এইসকল ত্রুটি সারাইতে যানবাহন মালিকদেরও সচেতন হওয়া উচিত। তাহারা এমন গাড়ি রাস্তায় নামাইতে চালকদের বাধ্য করিতে পারেন না। দেখা যায়, বত্সরের পর বত্সর গাড়ির ফিটনেস নবায়ন করা হয় না।  আমরা এমন পরিস্থিতিরও অবসান চাই। এইজন্য বিআরটিএ’র নানা অনিয়ম ও হয়রানি বন্ধ করিতে হইবে। দ্রুত ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। সড়কে যেই হারে দুর্ঘটনা ঘটিতেছে তাহাতে জাতীয়ভাবে ইহাকে দুর্যোগ ঘোষণার দাবি উঠিয়াছে। শুধু দাবিই যথেষ্ট নহে, আমাদের সকলেরই সেইভাবে কাজ করিয়া যাওয়া আবশ্যক।