যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার ২০তম বার্ষিকীতে আফগানিস্তানে আবার ক্ষমতায় ফিরেছে তালেবান। যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং আফগানদের জন্য এটা বেদনাদায়ক ঘটনা। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা করে আল-কায়েদার আশ্রয়দাতা তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই সফল বলা যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল তালেবানকেও দমন করতে বা শেষ করে দিতে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে একটা বহুত্ববাদের সমাজ তৈরি, মানবাধিকার এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল।
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্ব অনেকটাই ব্যর্থ। কারণ আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় অনেক ভুল এবং সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সুশাসন আনতে পারেনি, আবার পাকিস্তানকেও তালেবানকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে পারেনি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত আফগান নেতারা দুর্নীতির মধ্যে ঢুকে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

নিরাপত্তা বাহিনীকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা খরচ করলেও কোনো ফল হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুত সময়ে জয়ী হওয়া তালেবান কি টিকে থাকতে পারবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, তালেবান কী প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করে, অস্ত্রধারী বিরোধীদের মোকাবিলা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং বহিঃশক্তির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে তার ওপর নির্ভর করে। ইতিমধ্যে নারীরা আন্দোলনে নেমেছে এবং বিরোধীরা লড়াই শুরু করে দিয়েছে।
অস্ত্রধারী বিরোধী পক্ষ: তালেবানের ভেতরের অনেকেই এখন তালেবানের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তালেবানকে ভাঙার চেষ্টা করেও ন্যাটো কিছু করতে পারেনি। কিন্তু তালেবানের ভেতরেই বিভিন্ন গ্রুপ আছে যাদের রাষ্ট্র সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই, ধর্মীয় বিশ্বাসই তাদের কাছে বড়। তারা বাস্তব জগত্ সম্পর্কে খুব একটা বোঝে বলেও মনে হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে অনেকে মাঝারি মানের তরুণ কমান্ডার। তারা কেবল জেহাদ করতেই ভালোবাসে।
১৯৯০-এর দশকের তালেবানের অব্যবস্থাপনার সরকার সম্পর্কে কোনো ধারণাই তাদের নেই। জাতীয় এবং প্রাদেশিক নেতাদের চেয়ে এরা অনেক বেশি কট্টর। তালেবানকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ সব নেতা এবং কমান্ডারদের পর্যাপ্ত আয়ের ব্যবস্থা থাকবে। স্থানীয় অর্থনীতিতে তাদের সংযুক্ত করতে হবে। যেমন খনিতে খননকাজ।

তালেবানের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হলে বিচ্ছিন্ন হওয়া নেতা বা বিদেশি যোদ্ধারা তালেবানের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেট খোরাসানকে (আইএস-কে) সহায়তা করতে পারে। এদের বিরুদ্ধে তালেবান অনেক লড়াই করেছে। আইএস-কে হয়তো এখন তালেবান শাসনের অবসান ঘটাতে পারবে না, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য তারা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আইএস-কের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তালেবানেরই এক সময়ের কমান্ডার মোল্লাহ আখতার মুহাম্মদ যিনি ২০১৬ মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছিলেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল তালেবান। কারণ তার গ্রুপটি খুব নিষ্ঠুর, সাম্প্রদায়িক এবং স্বাধীন ছিল। তাই আইএস-কে তালেবানের জন্য একসময় বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। গত ২৬ আগস্ট কাবুল বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েই আইএসে-কে তাদের সামর্থ্য দেখিয়েছে।

সহিংসতা অব্যাহত থাকলে আফগানিস্তানে চীনের বিনিয়োগও হাতছাড়া হতে পারে। কারণ তালেবান এখন চীনকেই প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার মনে করে। আফগানিস্তানের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় আইএস-কে হামলা চালায়। তারা শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ লাগাতে চায়। যদি তালেবান এই হামলা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি হবে তালেবানের।
আবার ইরান আফগানিস্তানে তার ফাতিমিয়ুর ইউনিটকে শক্তিশালী করতে পারে। ইরান তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং যুদ্ধের জন্য সিরিয়া ও লিবিয়ায় পাঠিয়েছিল। এই যোদ্ধার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। তারা আফগানিস্তানে এসে তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। তবে ভবিষ্যতে তালেবানের জন্য বড় হুমকি তালেবাবিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত আহমাদ মাসুদ এবং আমরুল্লাহ সালেহ যাদের গ্রুপ পাঞ্জশির উপত্যকায় তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে।

সরকার পরিচালনা: এখন তালেবানের ছায়া সরকার চলছে। তালেবান কঠোর নীতির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রেখেছে। তাদের ভয়ে দুর্নীতি বা চুরি কিছুটা হলেও কমেছে। তারা করের টাকা পাচ্ছে। তারা দুর্বল অর্থনীতি সামাল দিতে কাজ করছে। তবে তারা পপি চাষ বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা এখন সহায়তা পেতেও শুরু করেছে। কিন্তু বিদ্যুত্ এবং পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের প্রযুক্তিগত সামর্থ্য নেই। তারা ক্ষুদ্র অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার পরিস্থিতিতে এখন নেই।
এমনকি খরা নিয়ন্ত্রণ করার মতো ব্যবস্থাও তাদের নেই। এসব সেবা দিতে তালেবানের দরকার নীতি প্রণয়ন করা। এজন্য টেকনোক্র্যাট ও বিদেশি সহায়তা দরকার। যেমন পরামর্শ দরকার, তেমনি বাস্তবে কাজের লোকও চাই। এমনকি এনজিওর সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তালেবান যদি প্রতিশোধের শাসনের দিকে যায়, তাহলে টেকনোক্র্যাটরা ভয়ে দেশ ছাড়বে। তালেবান যদি নিষ্ঠুর শাসন পরিচালনা করে তাহলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। বিদেশিরা বিনিয়োগ থেকে সরে যাবে।
অর্থনীতি এবং অঞ্চল: বর্তমানে তালেবান দেশের কোটি কোটি ডলার ফেরত পাচ্ছে না। নেই সহায়তাও। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল বা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের বরাদ্দ করা তহবিল ফেরত নিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও আটকে দিয়েছে। দেশের অবৈধ এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি অনেক ক্ষতির মুখে। তালেবান চাইলেই পপি অর্থনীতি দ্বিগুণ করতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক বাজার ইতিমধ্যে সিনথেটিক এবং অপিয়ডে পূর্ণ। তালেবান মাদকমুক্ত দেশ গড়তে পপি উত্পাদন বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। অথচ অর্থনীতি এর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। হঠাত্ করে বন্ধ করে দিলে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়বে। এসব মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা এখন তালেবানের নেই। আবার খরা, করোনার হানায় অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ রূপে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির ৯০ শতাংশ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে। ৩০ শতাংশ খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে। তাই হঠাত্ করেই পপি চাষ বন্ধ করলে তালেবানের মাঝারি মানের কমান্ডার এবং যোদ্ধাদের আয়ে ধস নামবে। নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তালেবানকে এখন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বেকার হয়ে পড়েছে বহু সেনা সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে বেতন দিত। কিন্তু তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা তালেবানের জন্য কঠিন হবে।
কাজ না পেলে তারা ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়তে বা তালেবানবিরোধী মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগ দিতে পারে। কিন্তু তালেবান ইরান, চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই তালেবানকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ইরান অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি সহায়তা করতে পারবে না, পাকিস্তান সামরিক এবং গোয়েন্দা সহায়তা দিলেও অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে চীন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোই অর্থসহায়তা দিতে পারে।
পশ্চিমা বিশ্ব দোলাচলে: যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য বলেই দিয়েছে তারা তালেবানের আসন্ন সরকারকে স্বীকৃতি দেবে না। তবে এসব দেশ বলেছে যে, তারা তালেবানকে ত্যাগ করছে না। তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। তারা স্বীকৃতি দেবে শর্তসাপেক্ষে। বিশেষ করে নারী অধিকার এবং সন্ত্রাসবাদ ইস্যুই পশ্চিমাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আফগানিস্তানে একটা বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার রক্ষা করার ওপরই নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্ব তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে কি না। কিন্তু তালেবান যদি ইরান, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা বা মিয়ানমারের মতো আচরণ করে তাহলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকবে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ আফগানরা।
ইত্তেফাক/টিআর
