১৫ বছর শিকলবন্দি জীবন

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০৮

গত ১৫ বছর ধরে শিকলবন্দি জীবনযাপন করছে ২৪ বছরের যুবক ইলিয়াস। সে সিংগাইর উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা কাশিমপুর গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে।

তার মা পলি আক্তার জানান, ‘ইলিয়াসের পিতা হোসেন আলী প্যারালাইসিস রোগী ছিলেন। ধার-দেনা করে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ করার পর টাকার অভাবে আর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। প্রায় এক বছর আগে তিনি মারা যান। নিজে অসুস্থ এবং ছেলের চিকিৎসা না করাতে পেরে এক বুক হতাশা নিয়েই তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ইলিয়াস ছোটবেলায় ভালোই ছিল। ছিল চঞ্চল প্রকৃতির। বয়স যখন ৯-১০ তখন লাঠি দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করা হয়। তখন থেকেই সমস্যা দেখা দেয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাগলামিও বাড়তে থাকে। টাকার অভাবে কিছুই করতে পারি না। ফলে হাতুড়ে কবিরাজ আর ফকিরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে তারা যে চিকিৎসা দিতো সেটাই করতাম। এতে কোনো কাজ হয়নি।’

তিনি আরও জানান, ‘ষুধ খাওয়াইলে কিছুটা ভালো থাকে। তখন খাবারও খেতে চায়। তা না হলে কিছুই খায় না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। চিকিৎসা করার মতো টাকা নেই। জায়গাজমি ও থাকার ঘর নেই। মেয়ের ঘরে থাকে। ধার-দেনা করে মেয়ে শরিফাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্বামী খারাপ বলে ছাড়াখাড়া করে আনা হয়েছে। বিদেশ পাঠানো হলেও সেখানে তার কাজকর্ম নেই। তারই দিন চলে না। এরপরেও সে যা দেয় তাই দিয়ে চলি। না দিলে খুবই কষ্ট হয়। সরকার কতজনকে ঘর দেয় আমাদের মতো লোকদের দেয় না। বিধবা কার্ড নেই। তবে মেম্বার বলছে কার্ড করে দেবেন। কেউ সাহায্য করে না। এরপর পাগল ছেলে সামনে যা পায় তাই ভেঙে চুরমার করে। একবার ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলে জিনিসপত্র পুড়ে যায়। ’

ইলিয়াসের মামা জাফর খান জানান, ‘ইলিয়াসের পায়ের শিকল খুলে দিলে কারো নিস্তার থাকে না। ওর বাবা মারা গেলে জানাজার জন্য পায়ের শিকল খুলে দেওয়া হয়েছিল। এরপর সে উধাও হয়ে ১৩ দিন পর নিজেই বাড়ি ফিরে আসে। তখন পায়ে শিকল দিয়ে তালা দিতে গেলে ওর মাকে আঘাত করে। সারাক্ষণ ঘরে এবং বারান্দায় বসে থাকে। গাছতলায় বেঁধে রাখলে বৃষ্টিতে ভিজে এবং মশা কামড়ায়। শিকল দিয়েই বেঁধে রাখি। গোসল, পায়খানা, প্রস্রাব করতে হলেও শিকল বাঁধা অবস্থায়ই করাতে হয়। নচেৎ কখন কাকে মারবে বলা মুশকিল। তাই ওকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

স্থানীয় ইউপি মেম্বার হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘ইলিয়াস ছোটবেলায় খেলাধুলা করত এবং সবার সঙ্গে মিশত। ভালো ব্যবহার করত। হাসিখুশি থাকত। দিন যতই যাচ্ছে অবনতি ঘটছে। তবে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারলেই সে ভালো হয়ে উঠবে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য ইলিয়াসের মা টাকা পাবে কোথায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইলিয়াসদের একটা ঘরের খুবই প্রয়োজন। অথচ তাকে ঘর দেওয়া হয় না। তবে তিনি বিধবা ভাতার কার্ড করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন।

ইত্তেফাক/এমআর