কালিয়ার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একাধিক গ্রাম

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩:৫৫

নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীর গত কয়েক বছরের অব্যাহত ভাঙনে কয়েকটি গ্রামের নাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে। চলতি বছরে নবগঙ্গা ও মধুমতী নদীর বিভিন্ন স্থানে তীব্র ভাঙনে প্রায় ৩ শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। গৃহহীন হয়ে পড়েছে প্রায় ২ সহস্রাধিক মানুষ। হুমকির মুখে পড়েছে কালিয়া পৌর শহরও।

বর্তমানে ভাঙন পাড়ের প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর যে কোন সময় নদীগর্ভে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাড়ি-ঘর হারা মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে আশপাশের গ্রামগুলোতে। ক্ষতিগ্রস্তরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার প্রাণ কেন্দ্র কালিয়া পৌরশহরের বড়কালিয়া, বৃহাসলা, ও কুলসুর নামক স্থানে নবগঙ্গা নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের ভাঙনে বড়কালিয়ার সুমন সরদার, রাসেল সরদার, রহিম শেখ, রিয়াজ শেখ, আব্দুল গফফার, ছোট মনিও আবু সুফিয়ানসহ ২৫ টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন পাড়ে দাড়িয়ে থাকা আরও অন্তত ৫টি পরিবারের মানুষ রাতের ঘুম হারাম করে সেখানে বসবাস করছেন।

কালিয়া পৌরসভার অপর একটি জনপদের নাম কুলসুর। এক সময় এখানকার মৃৎশিল্পের খ্যাতি ছিল সারা দেশে। নবগঙ্গা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে মৃৎশিল্পের কারিগর পাল গোত্র রয়েছে মারাত্মক সংকটে। গত কয়েকে বছরে গ্রামটির এক তৃতীয়াংশ জমিসহ প্রায় ২৫টি বাড়ি, গাছপালা ও ফসলী জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। চলতি বছর ওই নদীর ভাঙনে ৪টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৩টি বাড়ি বলে গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন।

একই নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামের নাম দেবীপুর। চলতি বছরের ভাঙনে ওই গ্রামে প্রায় ১৩৫টি বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে বলে ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন। তার পাশেই গ্রাম বাহিরডাঙ্গা গ্রামের প্রায় ৪০টি পরিবার নদী ভাঙনে গৃহহারা হয়ে পড়েছে।

উপজেলায় মৃৎশিল্পীদের আর একটি জনপদের নাম শুক্তগ্রাম। গত কয়েক বছরের  ভয়াবহ ভাঙনে গ্রামটির দুই তৃতীয়াংশ নবগঙ্গার ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে। চলতি বছরের ভাঙনে গ্রামটির প্রায় অর্ধশত বাড়িঘর ও সরকারি স্থাপনাসহ বাজারের দোকান পাট নদীগর্ভে নিমজ্জিত হয়েছে। নদীর পানি কমার সাথেই ভাঙনের তীব্রতাও শুরু হয়েছে।

একই ভাবে মধুমতি নদীর ভাঙনে গত কয়েক বছরে কালিয়ার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ঘষিবাড়িয়া গ্রাম। ওই সময়ে প্রায় শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি নদীতে চলে গেছে। চলতি বছরও গ্রামটির মিঠু পাল ও সুমিত্রা পালের বাড়িসহ ৪টি বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে।

এছাড়া মধুমতি নদীর ভয়াবহ ভাঙনে উপজেলার চরমধুপুর গ্রামের একটি অংশ ইতিমধ্যেই নদীতে নিমজ্জিত হয়েছে। গত ২ বছরের ভাঙনে গ্রামটির কেরামত শিকদার, সবুজ শিকদার, মিটু শিকদার, সামাদ শিকদার, বিমাদ মল্লিক ও রজব আলী মল্লিকসহ প্রায় ১৫ টি বাড়ি ভাঙনে বিলীন হয়েছে।

কালিয়া পৌরসভার মেয়র মো.ওয়াহিদুজ্জামান হীরা বলেছেন, পৌর শহরের বড়কালিয়া, বৃহাচলা ও কুলসুরে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের ভাঙনে পৌর শহরের ৪০/৪৫ টি বাড়ি নদীতে গেছে। দ্রুত ভাঙন রোধে পদক্ষেপ না নিলে আরও অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে গৃহহারা হয়ে পড়বে বলে তিনি দাবি করেছেন।

কালিয়ার ইউএনও মো. আরিফুল ইসলাম বলেছেন, নবগঙ্গা ও মধুমতির ভাঙনে এবছর উপজেলার প্রায় ৩ শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা সহ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। বিষয়টি নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করেছি। নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, সম্প্রতি তিনি নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, কালিয়ার ইউএনও, পৌর মেয়রসহ উপজেলার ভাঙন কবলিত কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন করে ২ শতাধিক ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করেছেন এবং ভাঙন কবলিত ৮ গ্রামের ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছেন। যাতে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

ইত্তেফাক/এমআর