আনজীর লিটন

আলোকিত শিশুসাহিত্যিক

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:৪৭

 ‘বিষয়বৈচিত্র্য এবং উপস্থাপনশৈলী একটি সুলিখিত ছড়ার অনিবার্য শক্তি। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃন্তের উপর ভর করে ছড়া যুগ যুগ ধরে প্রবহমান। সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারে ছড়াকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ছড়ার সম্প্রসারিত রূপই হচ্ছে কবিতা। ছড়া লৌকিকতার গণ্ডি ভেঙে লাবণ্যে পরিপূর্ণ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। সেই থেকে ছড়া নিঃসন্দেহে আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। বদলেছে উপস্থাপনরীতি। বদলেছে বিষয়-ভাবনা ছন্দ। বদলেছে চিত্রকল্প। সময়ের হাত ধরে বাস্তবতার নিরিখে ছড়া নতুন মাত্রায়  বিকশিত হচ্ছে।’ ছড়ার এই বিকশিত ধারার প্রতি নিবেদিত থেকে আনজীর লিটন রচনা করে যাচ্ছেন আধুনিক সময়োপযোগী বহুমাত্রিক বর্ণিল বৈচিত্র্যপূর্ণ ছড়া। সে সব ছড়ার মাঝে সম্পৃক্ত আছে আমাদের লোকজ ধারা। আছে ঐতিহ্যগত চিরন্তন ছন্দের আধুনিক উপস্থাপনা। চিরচেনা বিষয় নিয়ে আনজীর কত সহজেই লেখেন—

‘: নাম কী ঋতুর? 

:  বর্ষা

ভেজা ভেজা পাতার বুকে

বৃষ্টি জমে দারুণ সুখে

একটুখানি আড়াল পেতে

একটা ছাতাই ভরসা

আহা! বর্ষা আমার বর্ষা।’

আনজীর লিটন তিন দশকের বেশি সময় ধরে শিশুসাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন। আধুনিক ছড়াসাহিত্যে নিজস্ব ধারা তৈরি করে আনজীর লিটন দৃঢ়তার সঙ্গে নিবেদিত শিশুসাহিত্য ভুবনে। শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প ছড়া, উপন্যাস ও নাটক রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর লেখা আঙ্গিকের নতুনত্বে ও বিষয়ের অভিনবত্বে ছোটদের এবং বড়দের কাছে সমানভাবে প্রিয়। তাঁর ছড়ায় বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে লোকবাংলার আধুনিক রূপ। আনজীরের হাতে চিরায়ত ছড়ায় এসেছে নতুন দোলা। প্রচলিত বৃত্ত ভেঙে নিরীক্ষাধর্মী ছড়ায় আনজীর তিন লাইনের অন্ত্যমিলে তিন রকম দৃশ্যকল্পে তৈরি করেছেন ত্রিমাত্রিক ছড়া—

‘ইশকুল তুমি, কোথা থেকে এলে? সেটাও জানতে চাই না

শুধু জেনে রাখো দয়ার সাগর তোমার বুকেতে পাই না

এক্সজামে তুমি আমায় কাঁদিয়ে খুব মজা পাও তাই না?’

আনজীর লিটনের ছন্দের হাত বড় মিষ্টি। তাঁর ‘নির্বাচিত ছড়া’ পড়লে দেখা যায় ধ্রুবপদের মতো কিছু বিষয় চলে এসেছে : ভাষা, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ইত্যাদি। শিশুমনের ছবি অঙ্কন এবং শিশুদের সম্পর্কে বড়দের মন-ভাবনাটা আবিষ্কারে তিনি সিদ্ধহস্ত। শিশুরা খেলে, দেখে, কোনো বৈষম্য বোঝে না। তারা সব সময় মুক্ত মনের। তারা কেবল পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে চায়। বড়দের মতো আরো অনেক বড় হতে চায়। শিশু-কিশোর মনের বড় হওয়ার অপার স্বপ্নে ভরা ‘আমি হব’ তে আনজীর লিখেছেন—

‘আমি যদি আমার স্কুলে মালতি মিস হতাম—

অঙ্ক খাতা করে দিতাম শুধুই ড্রয়িং খাতা

আঁকতে থাকো মনের মতো দাও ভরে সব পাতা।

হতাম যদি ফারজানা মিস কেমন হতো তবে?

বনে গিয়ে গাছ গাছালি চিনিয়ে দিতাম কবে!

...   ...  ...   ...   ...  ...

তোমরা তবে জেনে রেখো, বড় হয়ে আমি

একদিন ঠিক টিচার হব, সবার সেরা দামি।’

এমনি করে অনজীর শিশু-কিশোর মনের বিচিত্র সাধের কথা বলেছেন। এখন তো খেলার মাঠ নেই। শিশুমন খেলতে চায়। বারান্দাকে সে মাঠ বানিয়ে নেয়  ‘আমরা’ ছড়ায়—

‘আমরা হলাম এই সময়ের এই যুগেরই পিচ্চি

ফ্লাট বাড়িটার বারান্দাকে মাঠ বানিয়ে নিচ্ছি

টিভি দেখে সময় কাটাই

চিনি না তো ঘুড়ি লাটাই

জন্মদিনে পাই উপহার, বন্ধুকেও দিচ্ছি।’

আনজীর লিটন তাঁর ছড়া-কবিতায় আমাদের মাটি, আমাদের দেশ, ভাষা, সংগ্রাম, আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ—এসব কিছু একসূত্রে গেঁথে দিয়েছেন।

‘এখানে আমার বঙ্গবন্ধু’ ছড়ায়—

‘এই যে আমার আমাদের মতো/ গেয়ে যায় গান সুখে অবিরত/ এই যে ফসল উর্বরা মাটি/ ফুল পাখি নদী অপরূপ খাঁটি/ বিজয়ের উল্লাস/ এখানে আমার বঙ্গবন্ধু মহানায়কের বাস।...’

ছড়ায় আনজীর লিটন পথ চলেছেন নির্মোহভাবে। ছন্দকে ভেঙে ভেঙে প্রতিনিয়ত ছড়াকে করে তুলেছেন উত্তরাধুনিক। ছড়াসাহিত্যে এখানেই তাঁর ভিন্নতা।

ছড়ার পাশাপাশি সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। প্রতিনিয়ত লেখার মাধ্যমে শিশুর মানস গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ১৯৯২ সালে তাঁর প্রথম ছড়ার বই ‘খাড়া দুটো শিং’ প্রকাশিত হয়। তারপর আর থেমে থাকেননি আনজীর। একে একে বেরিয়েছে, ‘অ আ ই’, ‘ও ছড়া তুই যাস কই’, ‘প্রিয় ছন্দে নতুন দোলা’, ‘আকাশভরা ফুল’, ‘বাবা বাড়ি ফেরেনি’, ‘বাড়ি কই বাড়ি নাই’, ‘মেঘের ঝুমঝুমি’, ‘ছড়ায় ছড়ায় ছড়ানো’, ‘গুডবয় ব্যাডবয়’, ‘গানের সুরে অনেক দূরে’, ‘রঙের দেশে তুলির রাজা’, ‘দুপুর নাচে টাপুর টুপুর’, ‘রঙের গাড়ি ঝমঝম’, ‘রঙের পুকুর’ ইত্যাদি ছড়ার বই। ‘সবুজ ঘাসের সাইকেল’ গল্পের বই। এছাড়া ‘লাল পরী লাল টমেটো’, ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’, ‘বিল্লি বয় মনি’ বইগুলোও শিশুসাহিত্যে নতুন সংযোজন। ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম’, ‘শামসুর রাহমান’ তাঁর লেখা দুটি জীবনীগ্রন্থ। শিশুদের জন্যে তাঁর লেখা কিছু প্রবন্ধের বইও রয়েঝে। এসব কিছুকে ছাপিয়ে একজন আলোকিত ছড়াশিল্পী হিসেবেই আনজীর লিটন বেশি সমৃদ্ধ। ছোটদের দেখার চোখ কিন্তু আলাদা। তারা মূলত সাড়া দেয় বিস্ময়বোধ আর কৌতুকরসে। তাদের মনটাও থাকে কৌতূহলি। তারা সর্বদা ভালোবাসে অবাক হতে আর মজা পেতে। এই শিশুর মনোজগত্ সম্পর্কে আনজীর লিটন উত্তমরূপে জ্ঞাত আছেন, তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিচ্ছে তার নানা ধরনের রচনা। সাদামাটা স্বভাবের আনজীর লিটন নিজেকে নিয়ে ছড়ার পঙিক্ত সাজিয়েছেন দেশের অতি সাধারণ অনুষঙ্গের সাথে। ‘একটা ছড়ায়’—

‘একটা হাঁস/ একটা ঘাস/ একটা ফুল/ একটা দুল/ একটা শহর/ একটা গ্রাম/ একটা লিটন/ একটা নাম।’

এমনই সব মনরাঙানো ছড়া দিয়ে সাজোনো তাঁর ছড়ার ভুবন। সে সব ছড়ায় মায়ের কথা, বন্ধুর কথা, দেশের কথা যেমন আছে, আছে সামাজিক জীবনের অসঙ্গতি তাড়াতে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কড়া চাবুকও।

ছড়া সম্পর্কে আনজীর লিটনের ভাবনা দিয়ে শেষ করি। আনজীর লিটন ছড়ার কথা বলতে গিয়ে লেখেন—‘ছড়ায় বেঁধেছি প্রাণ। চাই ছড়ায় নতুন বৈচিত্র্য তৈরি করতে। প্রেরণা চাই পাঠকের কাছ থেকে, যারা ছড়া ভালোবাসেন। ছড়ার প্রতি এই ভালোবাসা কোনো বয়সের জালে বাঁধা থাকুক তা-ও চাই না। আমি মনে করি, সাহিত্যের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ছড়া আবির্ভূত হয়েছে। তাই ছড়া শুধু ছোটদের নয়, বড়দের নয়, ছড়া আসলে সকলের’।

শিশুসাহিত্য রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ আনজীর লিটন দুইবার পেয়েছেন—এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ছোটদের নাটকে পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’র জন্য পেয়েছেন সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার। আনন্দের কথা, এবার তিনি পেলেন আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পুরস্কার বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০২০। জয়তু আনজীর লিটন।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন