তরঙ্গিনীকে আমি দেখিনি।
তরঙ্গিনী অন্তঃসলিলা।
মাটির নিচে আমার চোখ যায় না।
গাছের কাণ্ড পাতা ফলমূল দেখি, শিকড় বাকড় দেখি না।
অগভীর দৃষ্টি।
সহজ মানুষ একমাত্র অলোকদৃষ্টিসম্পন্ন। তিনকাল দেখে বা মনে করলে দেখতে পায়। ঝক্কি কম না বেবাক দেখাতে। এজন্য তরঙ্গিনীর কথা সে আমাকে বলে না। সুতনুকার কথা বলে। কুরুল্লার নদী সুতনুকা। দৃশ্যমান বানভাসি সমেত। এত কুরুল্লা। সহজ মানুষ বলে, ‘এ হলো কুরুল্লা ফোবিয়া।’
কুরুল্লা কী?
‘তিতাস একটি নদীর নাম পড়ে নাই শালা!’
কুরুল্লার সঙ্গে কী সম্পর্ক অদ্বৈত মল্লবর্মণের বইয়ের? সহজ মানুষ আর কোনো রূপকথায় ডুবে যায়। বা আর কোনো নদীতে। অবগাহন। সেই নদীর কথাও সে আমাকে বলে না। আর কোনো নদীর কথা বলে। সেই নদী সারি। শারি না সারি। কাকচক্ষুজল নদীর। ছোট ছোট ঢেউ ঝিকমিক করে। নম্র সভ্য রোদে। সব নদী সব ঋতুর না, সারি শুধুই শীতকালের নদী। বেমানান রকম স্নিগ্ধ পারিপার্শ্বিক রুক্ষতায়।
রাঙামাটি আমি যাইনি। মাটিরাঙায় গেছি। সেখানে গণরোষে পড়েছিলাম এবং গণপিটুনিতে হত হতে নিচ্ছিলাম। তবে সেটা ঘটেনি। ত্রাতা সহজ মানুষ। কেন? এই পৃথিবীতে এক সারি আছে বলে? সেই সারির সঙ্গে আমার দেখা হবে বলে?
সারি সেই ঢেউগুলো, সেই ‘ঢেউগুলো যে আমায় নিয়ে করে কেবল খেলা।’
এবং ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা হয়ে আসে।
সন্ধ্যার অন্ধকার। কালো রঙের বলে কি শোকের?
না। কালো রঙে শোকের চিহ্ন কখনো দেখে না সহজ মানুষ। সমূহ শোক দেখে হরিতে। চিরহরিত্ শোক।
শোকের রং হরিত্ না হলে হলো?
ভুল বানান যেমন ‘ভূল’।
নীল রঙের তবে কী মানে হয়?
হলুদ রঙের?
কমলা-লাল রঙের?
‘দেখা যায় বলে তারা মনে করে তারা সব রঙের মানে বুঝে গেছে। নীল বিষাদের রং, লাল-কমলা উত্সবের রং বলে ফতোয়া দিয়ে রেখেছে। নীল রঙের কনডম তবে কেন বানায়? পিংক রঙের কনডম না হয় ফুরফুরে ভাবের, নীল রঙের কনডম পরে কি অর্গান বিষাদে আক্রান্ত হবে না? বব ডিলানের মাউথ অর্গানের কথা আমি বলছি না। আরে! এই পৃথিবীতে নদী কি তেরোটা? কত নদী, কত সরোবর। অবগাহন করো। অবগাহন করো?’
দীপ্যমানের বউ কলকাতার মানুষ। তারা বলে ভাটবকা। সহজ মানুষ কখনো কখনো এমন ভাট বকে। কেন? বিরাট শিশু সে? তরঙ্গিনীকে আড়াল করে রাখে কেন?
সব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।
‘সহজ মানুষ, তরঙ্গিনী কে?’
‘তরঙ্গিনী এক নদী। সব নদীই তরঙ্গিনী।’
‘সব নদী কি এক নদী?’
‘সব ঘাস যেহেতু এক। কিংবা সব পাহাড়।’
‘অসহ্য! তরঙ্গিনীর জন্ম কোন পাহাড়ে?’
‘সব নদীর মা কি পাহাড়?’
‘সব কথা এত জটিল, সহজ মানুষ?’
‘না। সহজ।’
কে জানে কী? সহজ মানুষ যে হতে পেরেছে আর যে হতে পারেনি, আসমান জমিন ফারাক দুজনের। তবে আমি গেছি নদীর কুরুল্লায়, সহজ মানুষ কোন ছলনায় আটকাবে?
তরঙ্গিনীকে আমি দেখি না তবে তরঙ্গিনীর সঙ্গে আমার কথা হয়।
‘তরঙ্গিনী, আমার দৃষ্টি অগভীর। তুমি থাকো মাটির কত গভীরে?’
‘থাকি না। আমি বয়ে যাই।’
‘মাটির কত গভীরে বয়ে যাও?’
‘অঙ্ক করি না, আমি বয়ে যাই।’
‘অঙ্ক করো না, পৌরনীতি করো?’
তরঙ্গিনী হাসে।
তরঙ্গিনীর হাসি ঝরনার, যদিবা সে নদী।
আমি কেন তাকে দেখতে পাই না?
‘তরঙ্গিনী, তুমি আত্রেয়ী? অগ্নির পত্নী? রণচণ্ডী পতির মাথা ঠান্ডা করতে অন্তঃসলিলা হয়ে গেছ? ও তরঙ্গিনী, আমিই সে।’
‘সে কে? অগ্নি?’
‘না।’
‘নৈঋত?’
‘না।’
‘তবে কে?’
‘আমি এক শীতকাল হয়তো!’
‘শীতকাল!’
শীতকালে হলুদ কিছু পাতা উড়ান দেয়।
কোন পাতা উড়ে কোনদিকে যায়?
আমি যদি একটা উড়ান পাতা হই? কোনদিকে যাব?
তরঙ্গিনীর দিকে। আত্রেয়ীর দিকে।
এত সহজ?
জটিল কেন?
তরঙ্গিনী। তরঙ্গিনী! অগ্নি কতটা পোড়ায় জলকে?
‘চক্ষুদান ছাড়া তরঙ্গিনী হয় না।’
সহজ মানুষ কেবল জটিল মানুষের মতো কথা বলে যায়। চক্ষুদান কী? ক্ষুর আছে ঘরে। মরচে ধরে গেছে। তবে কাঁটা চামচ। স্টেইনলেস স্টিলের। কাঁটা চামচ দিয়ে চোখের মণি এত সহজে উপড়ে ফেলা যায়। সহজ মানুষের সহজ তরিকা। আমি চক্ষুদান করি সেই মতো। তরঙ্গিনীর জলৌকা আমার দুই চোখের মণি খুঁড়ে খায়।
এখন আমি দেখি তরঙ্গিনীকে।
সহজ মানুষের কথা অফুরান। তিন কালের কথা। সহজে ফুরায়? তবে আমি দেখি তরঙ্গিনীকে, এটা মনে হয় তাকে ক্লান্ত করে একটু। সে একটা বিজ্ঞাপন বিরতি নেয়। কনডমের বিজ্ঞাপন। পার্পল ভেরিয়েন্ট।
ফার্স!
তরঙ্গিনী আয়, আমরা একটা সন্তান উত্পাদন করি।
