দ্বাদশ শতাব্দীর তিব্বতীয় দার্শনিক শাক্য পণ্ডিত বলিয়াছিলেন, ‘বেশি কথা বিপদের কারণ। যতটা সম্ভব নীরব থাকিলে দুর্ভাগ্য এড়ানো যায়। খাঁচাবন্দি টিয়া বকবক করে, কিন্তু মুক্ত আকাশে উড়িয়া বেড়ানো টিয়া চুপ থাকে।’ আধুনিককালে উন্নয়নশীল বিশ্বের দায়িত্ববানদের আমরা খাঁচার টিয়ার মতোই আচরণ করিতে দেখিয়া থাকি।
কথা বলিতে হয় সংক্ষেপে এবং যুক্তিযুক্ত কথা। দায়িত্বশীল প্রতিটি মানুষের মনে রাখা দরকার যে, যাহা করিবেন, তাহার পিছনে যুক্তি থাকিতে হইবে এবং যাহা বলিবেন তাহারও একটি ভার থাকিতে হইবে। যেই কথার সারমর্ম নাই, যেই কথার কার্যকরণ নাই তাহা শুনিলে মানুষের কেবল হাসির উদ্রেক করে। আমরা সকলেই জানি, ভালো কথা বলা যত সহজ, পালন করা তত সহজ নহে। যাহা কেহ নিজে না করিতে পারে, তাহাও অন্যকে পালন করিতে বলা সমীচীন নহে। ইহা লইয়া প্রাসঙ্গিক ইসলামের একটি ঘটনার কথা অনেকেরই জানা আছে। একবার রসুলে আকরামের নিকট একজন লোক আসিয়া বলিলেন, হুজুর, আমার সন্তান প্রচুর মিষ্টি খাইয়া থাকে। আপনি নিষেধ করিলে সে আর মিষ্টি খাইবে না। নবিয়ে করিম তাহাকে সাত দিন পরে আসিতে বলিলেন। এই সাত দিনে তিনি মিষ্টি না খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করিলেন এবং তাহার পরেই কেবল ছেলেটিকে মিষ্টি খাইতে নিষেধ করিলেন। হইতে পারে বিষয়টি রূপক। কিন্তু এই কাহিনির একটি বিশেষ তাত্পর্য রহিয়াছে, বিশেষ বার্তা রহিয়াছে :তুমি নিজে যাহা করো তাহা অন্য কেহ করিলে তাহাকে নিষেধ করিতে পারো না এবং তুমি নিজে যাহা পারো না তাহাও অন্যের নিকট হইতে আশা করিতে পারো না। ইহা মোনাফেকিরই সমার্থক। আর ইহাও আমরা জানি, আল্লাহ তায়ালা মোনাফিকদের সহসা ক্ষমা করিতে চাইবেন না। মুনাফিকদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বহুবার ক্ষোভ প্রকাশ করা হইয়াছে এবং মুনাফেকি হইতে বিরত থাকিতে সাবধান করা হইয়াছে। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ১৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে অবস্থান করিবে, আর আপনি তাহাদের সাহায্যকারী হিসাবে কখনো পাইবেন না। আবার সুরা তওবার ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘হে নবি, কাফির ও মুনাফিক উভয়ের বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তিতে জিহাদ করো এবং তাহাদের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করো। শেষ পর্যন্ত তাহাদের পরিণতি জাহান্নাম, আর তাহা অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্থান।’
সুতরাং নিজে কোনো কর্তব্য পালন না করিয়া অন্যকে তাহা করিতে উপদেশ দেওয়ার মতো চরম ধৃষ্টতা আর কিছু নাই। দুঃখের বিষয়, সমাজের সর্বস্তরেই আমরা ইহা প্রকট আকারে দেখিতেছি। যাহারা উপদেশ দিয়া যাইতেছেন, তাহারা যদি নিজেদের বক্তব্য রেকর্ড করিয়া শোনেন, তাহলেই বুঝিতে পারিবেন তাহা কেমন শুনা যায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করিয়াও কেহ কেহ অন্যদের উপদেশ দিয়া থাকেন। আমরা গায়ে পড়িয়াও মিথ্যা কথা বলিতে শুনি, যাহা প্রায়শই অপ্রয়োজনেও বলা হইয়া থাকে। ভালো কথা বলিয়া তাহা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা নয়, উহা কি অর্থহীন হইয়া পড়ে না? শুধু অর্থহীনই হয় না, বরং মানুষ ভিতরে ভিতরে হাসে। ইহাতে মানুষ হাসে। নতুন প্রজন্মের জন্যও কোনো ইতিবাচক শিক্ষা বহিয়া আনে না। যাহারা দেশের নেতৃত্ব দেন তাহাদের উচিত নূতন প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করিয়া যাওয়া। এমন কিছু করা—যাহা হইতে আগামীর বাংলাদেশ কিছু শিখিতে পারে, ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করিতে পারে। সুতরাং প্রত্যেকের জন্যই অবশ্যপালনীয় বিষয় হইল, কোনো জাজমেন্ট প্রদানেরর পূর্বে ভাবিয়া দেখা যে, উহা কতটা যৌক্তিক।
