মোড়লদের ফাঁদে আর কত দিন!

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৪১

প্রায় শত বত্সর পূর্বে কবি শৈলজানন্দ বলিয়াছিলেন—‘মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নয়।’ শান্তি ও স্বস্তিতে থাকিবার স্বার্থেই তো মানবসভ্যতার বিকাশ হইয়াছে। সিন্ধু সভ্যতা হইতে শুরু করিয়া মিশরীয়, সুমেরীয়, পারস্য, ব্যাবিলনীয়, রোমান প্রভৃতি সভ্যতার মূলে ছিল মানবজীবনে স্বস্তিদান করা। একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়া বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কল্যাণে উত্পাদন ও সম্পদ অর্জনের দিক দিয়া মানবজাতি আজ এমন এক অবস্থায় উন্নীত হইয়াছে যে, বিশ্বের ৭৫০ কোটি মানুষকে স্বস্তিদায়ক ও সম্মানজনক জীবন উপহার দেওয়া খুব কঠিন কাজ নহে। বিশ্বব্যাপী উত্পাদন বাড়িতেছে, সম্পদ বাড়িতেছে, মাথাপিছু গড় আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িতেছে। সকল দেশেই কমবেশি বাড়িতেছে প্রাচুর্য ও ভোগবিলাস; কিন্তু এত প্রাচুর্যময় পৃথিবীতেও মানুষের মনে স্বস্তি নাই। শান্তি নাই। এই মাটির পৃথিবী যেন মানবের তরে থাকিতে না পারে, সেই চেষ্টা সুচারুভাবে অব্যাহত রাখিয়াছে পৃথিবীর বড় বড় দানবেরা। বিংশ শতকেই বিশ্ববাসী দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়াছে। ইহার পর আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিতে না পারিলেও বিভিন্ন ধরনের ছায়াযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের যে জটিল অবস্থা দেখিতেছি। এই সকল যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ দিনাতিপাত করিতেছে। এই দুর্বিষহ যুদ্ধাবস্থা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হইতে কম কীসে? কথিত উদার গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ইত্যাদির ভিতর দিয়াই বহাল রাখা হইতেছে বিচিত্র ধরনের যুদ্ধাবস্থা। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যত যুদ্ধ, যত অশান্তি, যত দুর্ভোগ-দুর্ভিক্ষ—সবই ঘটিয়া চলিতেছে কোনো না কোনো পরাশক্তির অঙ্গুলি হেলেনে।

তবে মনে রাখিতে হইবে, বন্দুক দিয়া একটি শক্তি আরেকটি শক্তিকে পরাজিত করিতে পারে বটে, ইহাতে ক্ষমতার হাতবদল কিংবা পতাকার রঙেরও পরিবর্তন হইবে বটে, কিন্তু ঐ জাতির সত্যিকার পরিবর্তন ঘটিবে না। একটি জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব কিংবা নিজস্ব অধিকার সুদূর পরাহত থাকিবে। দুঃখজনকভাবে, একটি জাতির যদি স্বকীয়তাই না থাকে, তবে ঐ জাতি কী করিয়া আত্মসম্মান লইয়া বসবাস করিবে? যদি কোনো জাতি পরাশক্তিদের মতানুযায়ী চলিতে না চাহে, তখন তাহাদের রুটি-পানিতে মারিবার ব্যবস্থা করা হয়। যেমন এখন একটি দেশের হাতে পর্যাপ্ত খাদ্য নাই, অর্থ নাই। অর্থাত্ দেশটির জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখিতে হইলে মোড়লদের নিকট হাত পাতিতেই হইবে। ইহা মোড়লের আরেকটি ফাঁদ; কিন্তু এই অর্থ প্রদানের বিনিময়ে মোড়লরা সেই দেশটির নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাষার পরিবর্তনও করিতে চাহে। এখন প্রশ্ন হইল—উন্নয়নশীল বিশ্ব যদি মোড়লদের দান-খয়রাত-ঋণ না গ্রহণ করে, তাহা হইলে কী এমন ক্ষতি হইবে? মোড়লরা তো দুই পয়সা ধার দিয়া তিন বেলা কিলাইতে চাহে। যাহা দিবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহা দিতেও তাহারা নানা ধরনের তালবাহানা করে, সময় প্রলম্বিত করে। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশগুলিকে ভাবিতে হইবে তাহারা আসলে কী চাহে। তাহারা নিজেদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অধিকার লইয়া স্বকীয় জীবনযাপন করিতে চাহে, নাকি একবার এক মোড়লের পায়ের তলা হইতে গড়াইয়া আরেক মোড়লের পায়ের তলায় পদদলিত হইতে চাহে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘মানবচরিত্রের উপরে পরাধীনতার অবনতিকর ফল আছে। অসত্যাচরণ কপটতা অধীন জাতির আত্মরক্ষার অস্ত্রস্বরূপ হইয়া তাহার আত্মসম্মানকে, তাহার মনুষ্যত্বকে নিশ্চিতরূপে নষ্ট করিয়া ফেলে।’ সুতরাং কোনো উন্নয়নশীল দেশ যদি মাথা উঁচু করিয়া বাঁচিতে চাহে, তবে তাহাকে স্যাক্রিফাইস করিতেই হইবে। কী সেই স্যাক্রিফাইস? তাহার দৃষ্টান্ত মিলিবে নবিজির (স.) জীবনীপাঠে। খন্দক যুদ্ধ হইতে আমরা জানিতে পারি, একটি পরিখা খননের সময় মহানবি (স.)-এর সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারি (রা.) বলিয়াছেন, ‘আমি দেখিয়াছি ক্ষুধার কারণে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেটে পাথর বাঁধা রহিয়াছে। তিন দিন ধরিয়া আমরাও কোনো কিছু খাই নাই।’ সুতরাং আমরাও মনে করি একটি জাতিকে আত্মসম্মানের সহিত স্বাধীন-সার্বভৌম ও নিজ অধিকারে থাকিতে হইলে প্রয়োজনে তাহাদের না খাইয়া না পরিয়া থাকিতে হইবে। এই সকল স্যাক্রিফাইস ভিন্ন একটি জাতি কখনো মোড়লদের দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিবে না।