>> মোশারফ হোসাইন
যৌনকর্মীর সন্তানদের পড়াশোনার জন্য বাসার কাছে স্কুল চালু করেছিলাম; বেশ ক’দিন ভালোই চলছিল স্কুলের কার্যক্রম। কিন্তু যৌনকর্মীর সন্তানদের আমি পড়াচ্ছি আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও আশেপাশের মানুষ বিষয়টাকে ভালোভাবে নিতে পারেননি। মেনে নিতে পারেননি আমার এই শিক্ষা কার্যক্রম। বাসায় প্রায়ই অভিযোগ আসতো এই বিষয় নিয়ে। একটা সময় বাসা ছাড়তে বাধ্য হই! বেশ কয়েক বছর আমি পরিবার ছাড়া থেকেছি। কখনো ঘুমিয়েছি রাস্তায়, রেলস্টেশন বা পার্কে। আলাপচারিতায় এমনটিই বলছিলেন শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মুঈদ হাসান তড়িত্।
তিনি বলেন, ‘এক ঈদে বস্তিতে শিশুদের নতুন জামা উপহার দিতে গিয়ে গিয়েছিলাম দল বেঁধে। বস্তির শিশুদের স্কুল নেই দেখে আমি ও আমার সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নিলাম স্কুল প্রতিষ্ঠা করব। এরপর সবাই মিলে চক, ডাস্টার, বই, খাতা, পেন্সিল, ব্ল্যাকবোর্ড ও চট কিনে শুরু হলো স্বপ্নপুরী স্কুলের যাত্রা। স্কুল শুরু করলেও প্রথমেই বস্তির শিশুদের অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পড়তে দিতে চাননি। যে কারণে শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের সদস্যরা মিলে তাদের শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন। এরপর ১১০ জন শিক্ষার্থী হয়ে গেল। এখন স্বপ্নপুরী স্কুলের বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। ছিন্নমূল শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণ, ঈদ পোশাক ও খাবার দেওয়া হয়।’ মুঈদ আরও বলেন, ‘শিশুদের জন্য কাজ করতে গিয়ে কখনো নিজের অনেক প্রিয় জিনিসও বিক্রি করতে হয়েছে। মানুষের জন্য কাজ করা একটা নেশা, আর আমি হয়ত সেই নেশাতেই আসক্ত। মানুষের যে কোনো সমস্যা জানতে পারলে সেটা সমাধানে লেগে যাই। শিশুদের সমস্যাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবায়, আমি পথশিশুদের সঙ্গে অনেক রাতেই ঘুমিয়েছি। শাহবাগ, ধানমন্ডি কখনো কমলাপুর রেলস্টেশনে থেকেছি। তাই আমি তাদের কষ্টটা বুঝতে পারি। যেমন, বৃষ্টি হলে আমরা আরাম আয়েশ করি কিন্তু পথশিশুদের মাথার উপর দিয়ে কী যায় আমরা ভাবি না।’ মুঈদ ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে কাজ করেছেন। ২০১১ সালে মুঈদ হাসান তড়িত্-এর হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের। শিশু অধিকার বাস্তবায়নে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বন্ধে বেশ সরব মুঈদ হাসান তড়িত্ ও তার সংগঠন। শিশু নির্যাতন বন্ধে বেশ কয়েকবার মানববন্ধনের পাশাপাশি সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা। পথশিশুদের পুনর্বাসন তাদের দাবির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিমধ্যে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে শিশুদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার না করার দাবি জানিয়েছিল সংগঠনটি। দেশের সকল গণমাধ্যম তা ফলাও করে প্রচারও করেছিল। শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে মুঈদ চালু করেছেন কালচারাল ক্লাব, সাইক্লেলিং ক্লাব, ফুটবল ক্লাব, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাব, প্রকৃতি ও জলবায়ু প্রকল্প, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পথপ্রাণি সেবা, ফুড ব্যাংক, রক্তদাতা গ্রুপ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্প, লিঙ্গ সমতা প্রকল্প, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ প্রকল্প, শিশু অধিকার বাস্তবায়ন প্রকল্প, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি, কর্মহীন মানুষের জন্য স্বাবলম্বী প্রকল্প, দুস্থ পরিবারের বিবাহযোগ্য কন্যার বিয়ের আয়োজনসহ নানা উদ্যোগ। সকল উদ্যোগই চলমান রয়েছে। গত ৭ বছর ধরে রমজান জুড়ে বিভিন্ন জেলায় ইফতার আয়োজন করে থাকে শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন। প্রতি ঈদে বিভিন্ন জেলায় ছিন্নমূল শিশু ও স্বপ্নপুরী স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঈদ পোশাক উপহার দেওয়া হয়। পূজোতে পোশাক উপহার দেওয়া হয় সনাতন ধর্মের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। শীতে উত্তরবঙ্গে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যার সময় খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয় বন্যার্তদের মাঝে। শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশ করে মাসিক পত্রিকা শিশু-কিশোর বার্তা ও শিশুদের উপযোগী বই। এছাড়া ছবি আঁকা উত্সব, বায়োস্কোপ আলোকচিত্র উত্সব, ঘুড়ি উত্সব, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন করে থাকে সংগঠনটি। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সমপর্কে তরুণ প্রজন্মকে জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সারাদেশের ১১ জেলায় প্রায় দেড় হাজার স্বেচ্ছাসেবী ও সদস্য রয়েছে শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের। সদস্যদের মাসিক অনুদান, উপদেষ্টাদের অনুদান ও ফেসবুক থেকে সংগৃহীত অনুদানের মাধ্যমেই ফাউন্ডেশনের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মুঈদ হাসান তড়িত্-এর শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইল শহরে। বর্তমানে তিনি আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের আন্তর্জাতিক কোর্সে। মুঈদ বলেন, ‘বর্তমানে শিশু অধিকার বাস্তবায়ন ও ছিন্নমূল শিশুদের পুনর্বাসন—এই দুটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি।’ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনন্দদায়ক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা মুঈদের বিশেষ দাবি।
