>> রায়হান রাশেদ
২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার আব্দুল হক স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের মাঠে বন্ধুদের নিয়ে বসেন সুজাদুর রহমান সুজাদ। বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেন সংগঠন বিষয়ে। বন্ধুরা সায় দিলেন। নাম দেন ‘আলো রক্তদান সমাজকল্যাণ সংস্থা’। চাঁদা নির্ধারণ করা হলো মাসিক ৫০ টাকা। শুরুতে ২৫ জন সদস্য ছিল। এখন সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। বন্ধুরা মিলে সুজাদকে সভাপতি নির্বাচন করেছিল প্রথমবার। বর্তমানে মুহিবুর রহমান সুহান আলোর সভাপতি।
রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি নিয়ে শুরু হয় আলোর পথচলা। সংগঠনটি বিনামূল্যে মানুষের রক্ত পরীক্ষা করছে, রক্ত দিচ্ছে, রক্তদানে মানুষকে সচেতন করছে। অসহায় ও গরিবদের ঈদে নতুন কাপড়, ঈদের বাজার করে দিচ্ছে। শীতার্তদের শীতবস্ত্র দিচ্ছে। অসহায়ের জন্য হুইল চেয়ার ও রিকশার ব্যবস্থা করছে।
রহিমা বেগমের ৭৫ বছর। গরিব-অসহায়; ভিক্ষা করতেন। শেষ জীবনে হাঁটতে পারতেন না। সারাদিন বিছানায় শোয়ে-বসে সময় পার করতেন তিনি। ‘আলো’র সদস্যরা তার খবর পায়। একদিন তারা দেখে আসে। বৃদ্ধের অসহায়ত্বের গল্পটা তাদের ভাবিয়ে তোলে। রহিমার জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করেন। হুইল চেয়ার প্রজেক্টের নাম রাখেন ‘হাসি’। লন্ডন প্রবাসী একজন সহযোগিতা করেছিলেন। বৃদ্ধা খুশি হয়ে বলেন, ‘আমার পেরালাইছিছ বেমারের লাগি আমি হাঁটাচলা করতাম পারি না। এক জাগাত বওয়া লাগত। আপনারা চিয়ার দিছইন, ই চিয়ারে বইয়া আমি বহুত আরাম করতাম পারমু। আল্লায় আপনারার ভালো করুক।’ সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ গ্রামের রোকসানাকেও চেয়ার দিয়েছেন। চেয়ার দেওয়ার এক মাস পর মারা গেলেন রোকসানা। সংগঠনের খবর প্রচারিত হলে গরিবেরা সাহায্যের জন্য আসে। সমস্যার কথা জানায়। কেউ বলে বাসায় খাবার নেই, বাজার নেই। সংগঠনটি কিছু টাকা দিত; কাউকে খাবার কিনে দিত। কিন্তু তাদের সমস্যা দূর হয় না। তাই গরিবকে স্বাবলম্বী করার চিন্তা শুরু হলো। সংগঠনটি রিকশা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রজেক্টের নাম রাখে ‘স্বাবলম্বী’। স্থানীয় সংগঠন ‘গরীব এতিম ট্রাস্ট’-এর সঙ্গে নেতৃবৃন্দ কথা বলেন। তারা সায় দেয়। খলগাঁও গ্রামের গোপালচন্দ্র আর শ্যামনগরের আব্দুর রহিমকে দুটি রিকশা দেওয়া হয়। গোপাল চন্দ্র বলেন, ‘তোমরার সংগঠনে আমারে একটা রিক্সা দিছইন। আমি খুশি। রিক্সা ছালাইয়া যা রুজি করি, ঐ টাখা দিয়া সংসার ছালাই। পুলাপাইনের পড়ার খরছ দিই। তোমরার ঋণ শোধ অইত নু।’ সংগঠনের সদস্য সুমন বলেন, ‘আমরা তাদেরকে বলেছি, কখনো বিক্রি করা যাবে না। রিকশা চালানো বন্ধ করে দিলে, আমাদের ফেরত দিবেন। আমরা অন্য কাউকে দিবো।’
সুনামগঞ্জের গোবিন্দপুর, রাধানগরে এখনো কাঁচা রাস্তা আছে। কিছু পিচঢালা পথের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। মানুষের চলতে খুবই কষ্ট হয়। ঠাট্টা করে অনেকে বলে, এই রাস্তায় গাড়ি করে চললে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যায়! আলোর সদস্যরা ঐক্য হয়ে রাস্তায় মাটি দিলেন। ভাঙা রাস্তা ঠিক করলেন; কোথাও ইট বসালেন। গোবিন্দুপুর থেকে শ্যামনগরে যাওয়ার আধা কিলোমিটার পথের আইল ছিল; অবশ্য মানুষ চলার উপযোগী নয়। অনেকটা ঘুরে যাতায়াত করতো মানুষ। এলাকাবাসীর এই সড়কটা খুব প্রয়োজন ছিল। আলোর সদস্যরা মাটি ভরাট করে পুরো রাস্তাটা করে দিলেন। এতে এলাকায় বেশ সাড়া পড়ে, সবাই খুব খুশি হন। সংগঠনটি করোনাকালে ত্রাণ ও মাস্ক বিতরণের পাশাপাশি সচেতনতা ক্যাম্প করেছে। এককথায়, সংগঠনটি মানুষ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে স্বদেশ নিয়ে। সভাপতি মুহিবুর রহমান সুহান বলেন, ‘অসহায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আমরা আনন্দিত। জীবনের সবটা দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’
