আঞ্জেলিনা জোলির জীবনে একটা দুঃখ এখনো রয়েই গেল! সন্তানের দুঃখ!
ব্র্যাড পিটের সঙ্গে বিচ্ছেদের পরও তার ঘর আলো করে আছে ৬ সন্তান। এখন পর্যন্ত জোলি জন্ম দিয়েছেন শিলোহ, নক্স ও ভিভিয়েনকে। এছাড়া কম্বোডিয়া থেকে ম্যাডক্স, ভিয়েতনাম থেকে প্যাক্স এবং জাহারাকে ইথিওপিয়া থেকে দত্তক নিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
২০১৫ সালে সিরিয়ার তত্কালীন সহিংসতায় উদ্বিগ্ন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি তুরস্কের একটি শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন। সেখানকার অমানবিক পরিস্থিতি দেখে দীর্ঘসময় ধরে সিরিয়ায় চলা এই নির্মম সহিংসতার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করেন। শরণার্থী শিবিরে পিতৃহীন তিন সিরীয় শিশুকে দেখে এবং তাদের বাবা-মায়ের করুণ মৃত্যুর বিষয়টি জেনে জোলি তত্ক্ষণাত্ তিন শিশুকেই দত্তক নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। এই শিশুদের বাবাকে সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল, আর তাদের মা বোমার আঘাতে মারা যান। ছয় সন্তান থাকার পরও তার এই দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রশংসা অর্জন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে আর সেই শিশুদের দত্তক নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই তিনজনকে দত্তক না নেওয়ার দুঃখটি এখনো ভুলতে পারেননি হলিউডের এই অভিনেত্রী।
সেসময় থেকে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন আরো জোরালোভাবে। তবে জাতিসংঘসহ বেশকিছু সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বিশ্ব শান্তিতে কাজ শুরু করেন আরো আগে থেকে। বলা যায়, ১৯৯৮ সাল থেকেই মানবতা প্রচার আর শরণার্থীদের সহযোগিতায় সবসময়ই এগিয়ে এসেছেন এ জনপ্রিয় অভিনেত্রী। আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত হওয়ার পর অভিনেত্রীর চেয়েও বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘মানবসেবার প্রতীক’ হিসেবে। রয়টার্সের এক সাংবাদিক ২০০৬ সালে এই অভিনত্রীেকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কি করতে ভালোবাসেন? জোলি হাসিমুখে উত্তর দেন, ‘দরিদ্র বা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে সবচেয়ে ভালোবাসি আমি।’
‘টম্ব রেইডার’ চলচ্চিত্রে শুটিং করতে গিয়েই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান আঞ্জেলিনা জোলি। কোনো শট নিতে নয়, কম্বোডিয়ার সাধারণ মানুষের নিদারুণ কষ্টে জীবন অতিবাহিত করার প্রত্যহ ঘটনা দারুণভাবে নাড়া দেয় তাকে। এ দৃশ্য জোলি ভেতরের আরেক মানুষকে জাগিয়ে দেয়। তখনই মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে অভিনয়ের মতোই আরেক পেশা হিসেবে বেছে নেন জোলি। বিশেষ করে তারপর থেকেই অধিকারবঞ্চিত শিশুদের জন্য জোলি বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন।
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক দূতাবাসে যোগাযোগ করেন জোলি। দূতাবাসের কাছে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানবেতর জনগোষ্ঠীদের তালিকা চান। এদিকে জাতিসংঘও জোলির এমন ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে তালিকা প্রদান করে। তারপর দেশে দেশে গিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেন জোলি, হয়ে ওঠেন ‘শান্তির দূত’।
সিয়েরালিওন ও তানজানিয়া ছিল আঞ্জেলিনা জোলির প্রথম সফর। এরপর দেশ দুটো থেকে ফিরেই ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ১৪ দিনের সফরে যান কম্বোডিয়ায়। তারপর ছুটে যান পাকিস্তানের আফগান শরণার্থীদের কাছে। এসব সফরে যে অর্থ ব্যয় হয় তা তিনিই বহন করেন। খুব বিলাসী বা দামি স্থানেও থাকেননি তিনি। বসবাস করেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক দূতাবাসের আঞ্চলিক কার্যালয়ের বাসস্থানেই।
মানবতার কাজে সফলতা দেখে অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক দূতাবাসের শুভেচ্ছাদূত করা হয়। ২০০১ সালের ২৭ আগস্ট তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ পর্যন্ত শরণার্থীদের সমস্যা সমাধানে জোলি বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ সফর করেছেন। এর মধ্যে ২০০৫ সালে কাশ্মিরে ভূমিকম্পের পর তিনি পাকিস্তান সফর করেন। ২০০৪ সালে সুদানে যুদ্ধের সময় দারফুর সফরে যান। ইরাকে সফর করেন ২০০৭ ও ২০০৯ সালে। এরপর ২০০৮ ও ২০১১ সালে আফগানিস্তানে। আর ২০১১ সালে গণবিদ্রোহের সময় জোলি লিবিয়া সফর করেন। ২০১২ সালে জোলি হাইকমিশনার অ্যান্টোনিও গাটারেসের বিশেষ দূত হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। আর এরপরই তিনি কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করেন আফগানিস্তান, সোমালিয়া ছাড়াও বিশ্বের আলোচিত শরণার্থীবিষয়ক নানা সমস্যা সমাধানে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান ও শিশুদের পাশে দাঁড়াতে গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আসেন আঞ্জেলিনা জোলি। সারাবিশ্ব চষে বেড়ানো এই ‘মানবতাময়ী অভিনেত্রী’ রোহিঙ্গা শিশুদের সাথে গল্প করেছেন, শুনেছেন তাদের দুঃখের কথা। শুধু তাই নয়, ক্যাম্প পরিদর্শনকালে জোলি রোহিঙ্গা নারীদের সাথে কথা বলে জানতে চেয়েছেন, তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে কি-না? জবাবে রোহিঙ্গারা নারীরা বলেছেন, তারা এখানে মরবে তবুও মিয়ানমারে ফিরে যাবে না। হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জিলিনা জোলি কুতুপালং ক্যাম্পের রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। সেখানে চিকিত্সাধীন রোগীদের সাথে কথা বলে জানতে চেয়েছেন তারা সেখানে সু-চিকিত্সা পাচ্ছে কি-না এবং তাদের কোনো অভাব অভিযোগ ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে কি-না। জবাবে রোহিঙ্গা নারীরা জোলির কথা শুনে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জানান, তিনি আসাতে এবং তার ব্যবহারে রোগীরা মুগ্ধ হয়েছেন।
এর পরদিন কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৫নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্রিফিংকালে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি জানান, বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গারা অন্যতম। রোহিঙ্গা সমস্যা যতদিন না সমাধান হচ্ছে ততদিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের পাশে থাকা উচিত বলে তিনি তার মতামত ব্যক্ত করেন। এ সময় জোলি বলেন, ‘দু-দিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘুরেছি। রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে উপলদ্ধি করতে পেরেছি মিয়ানমার সেনারা রোহিঙ্গাদের ওপর অমানসিক নির্যাতন চালিয়েছে।’
কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের তথ্য মতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু তাদের পরিদর্শন আর জোলির স্বভাবসূলভ আচরণ, মার্জিত ব্যবহার রোহিঙ্গাদের মুগ্ধ করেছে। সীমান্তের কোণারপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা দিল মোহাম্মদ তার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি একজন মহিয়সী নারী। তার সাথে কথা বলে রোহিঙ্গারা যে আশার আলো দেখতে পেয়েছে তাতে রোহিঙ্গারা খুশি।
প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জোলির কাছ থেকে তারা হূদ্যতাপূর্ণ আচরণ পেয়েছে। তিনি রোহিঙ্গাদের আপন করে নিতে এবং তাদের যথাযোগ্য মর্যাদায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বলেন, ‘তোমরা সুখে থাক, আমি আবার আসবো।’ জোলি ক্যাম্প ত্যাগ করার সময় অসংখ্য নারী-পুরুষ জোলিকে বিদায় জানান। এ সময় জোলি ছিলেন আবেগাপ্লুত।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য লস অ্যাঞ্জেলেসে জোলির জন্ম। মা-বাবা উভয়ে ছিলেন অভিনয়শিল্পী। এ মুহূর্তে চলচ্চিত্রে অভিনয় ও জাতিসংঘসহ বেশকিছু সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্বব্যাপী। আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত হয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘মমতাময়ী অভিনেত্রী’ হিসেবে।
তথ্য সহযোগিতায়:রফিক উদ্দিন বাবুল, উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা
