অনেকটা নিভৃতচারী এ দম্পতি ঝালকাঠি শহরের অনেকের কাছেই পারিবারিকভাবে অপরিচিতি। তবে রাস্তা দিয়ে চলাচলে কিংবা বাজার-ঘাটে ছোট্ট এ শহরের তারা পরিচিত মুখ। অনেকের কাছে প্রিয় দিদিমণি-স্যার, কারো কাছে হাত ধরে পথচলা ‘সেই দম্পতি’
পলাশ রায়
ঝাঁপসা চোখে রাস্তা পার হতে কষ্ট হয় এ বৃদ্ধ দম্পতির। শহরের প্রাণকেন্দ্র মিলন ফার্মেসির সামনে দিয়ে প্রধান বাজারে ঢুকতে কিংবা সোনালী ব্যাংক থেকে ফেরার সময় ফায়ার সার্ভিস মোড়ে অথবা পোস্ট অফিস থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তুলে বাজারে যাওয়ার পথে সাধনার মোড় এলাকা। রিকশা আর ব্যাটারিচালিত যানের কারণে রাস্তার পার হওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষেও দায়। তাই ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা তাদের প্রায়ই রাস্তা পার করে দেন। একজন আশি আরেকজন সত্তর ছুঁইছুঁই বয়সের। এ বয়সে তাদের কোনো বন্ধু নেই এ শহরে। বন্ধু বলতে যারা ছিলেন অনেকেই বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। আর যারা আছেন তারা আর ঘর থেকে বের হতে পারেন না বার্ধক্যের কারণে । হাতে হাত রেখে অগ্নি সাক্ষী করে জীবনের যে পথ শুরু করেছিলে এ দম্পতি, আজ জীবনের ৪৯তম ভ্যালেন্টাইনে সেই হাত ধরেই ‘পথ হাঁটিতেছেন পৃথিবীর পথে।’ সে জীবনের চড়াই-উত্রাইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে আজকের ভ্যালেনটাইনের এ গল্প—
১৯৯৬ সালে বিএ পাশ করে শিক্ষকতা শুরু করেন ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাভারামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের মেধাবী তরুণ দ্বিজেন রায়, পুরো নাম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। অনেকের কাছে ডিএল রায় নামেও পরিচিত। পাশের ইউনিয়ন কীর্ত্তিপাশার ভীমরুলি গ্রামের সেসময়কার নামকরা স্কুল ভীমরুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শুরু করেন শিক্ষকতা পেশা। দু-বছর পর সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। ১৯৬৯-৭০ সালের উত্তাল দিনগুলোতে জগন্নাথ হলে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে রাজনীতিতেও অংশ নেন মিস্টার রায়। গণ-অভূত্থানের যেদিন মিছিলে আসাদ গুলিবিদ্ধ হলেন সেদিনও দ্বিজেন রায় ছিলেন আসাদের অনেকটা পেছনের সারিতে। ঢাকার সেসময়কার তরুণ রাজনীতিবিদরা যারা বেঁচে আছেন তাদের অনেকের কাছে তিনি জগন্নাথ হলের ছাত্র ইউনিয়নের সাধু নামে আজও পরিচিত। যা হোক এম কম, এমএড শেষে ফিরে আসেন গ্রামে। ভীমরুলিতে দু-বছর সুনামে শিক্ষকতা করায় সেখানকার প্রভাবশালী বনেদী পরিবারের মেয়ে সন্ধ্যা রানির সাথে ১৯৭০ সালের ২০ জুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। একাত্তরের মুুক্তযুদ্ধ, স্বাধীনতা, এরপর পারিবারিক দৈন্য-দুর্দশায় সুখ-দুঃখের দিনগুলোর গল্প আমি শুনে আসছি সেই শৈশব থেকে।
বনেদী পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করলেও তেমন আর্থিক সাহায্য কিংবা উপঢৌকন পাননি ডিএল রায়। তারওপর বোন ভগ্নিপতি ও ভাইদের যোগসাজশে পারিবারিক ষড়যন্ত্রে বাপের পরিবার থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হতে হয় স্ত্রী সন্ধ্যাকে নিয়ে। এরইমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ঝালকাঠির গ্রাম-শহর সবখানে বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে পাকসেনা ও তাদের দোসররা। ভীমরুলি গ্রামের পেয়ারার ঘন অরণ্যে আশ্রয় নেয় হাজার হাজার পরিবার। জীবন মৃত্যুর মাঝখানে সেখানে দুর্বিসহ জীবন কাটে। এদিকে পাকবাহিনীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নির্দেশে পেয়ারা বাগান কাটা শুরু হলে সবাই ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। বাড়িঘর, ধান-পানসহ সব সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়ায় সন্ধ্যা রানির বাপের পরিবারেও চরম দুঃখ-কষ্ট নেমে আসে পেয়ারার জঙ্গলে। শ্বশুরবাড়ির পাশাপাশি বাপের বাড়ির সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হতে হলো। এ প্রসঙ্গে সন্ধ্যা রানি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে আপন মানুষগুলোও অনেক সময় পর হয়ে গেছে। হতে বাধ্য হয়েছে অনেকটা। ১০ দিন পায়ে হেঁটে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে দেখেছি, যাদের পথেই তার স্বজনরা ফেলে রেখে গেছে পাকবাহিনীর হাত থেকে নিজের প্রাণ রক্ষা করতে। আবার সদ্য বা কয়েক মাসের শিশুকে পথে পথেই মরতে দেখিছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে শরণার্থী শিবিরে বাপ বা শ্বশুরবাড়ির সাথে ঠাঁই হয়নি।’ সন্ধ্যার বাবার পরিবার তাদের রেখে আগেই চলে যায়। আর শ্বশুর তাকে রেখে কেবল তাদের ছেলে দ্বিজেনকে নিয়ে ভারতে শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু কয়েক মাসের গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে বাপ-ভাইয়ের সাথে যাত্রা করেননি মি. রায়। বলেছিলেন, বেঁচে থাকলে স্বাধীন দেশে ৩ জন একসাথে ফিরবেন অথবা পথেই মৃত্যুটাও একসাথেই হোক। ভারতের মধ্যপ্রদেশের রায়পুর জেলার একটি শরণার্থী ক্যাম্পে ২০ হাজার মানুষের সাথে ঠাঁই হলো এ দম্পতির। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল হরবন সিং, লে. জেনারেল কেজি সমাশেবারন এবং লে. জেনারেল হাজরা সিং বাংলা ভাষায় কথা বলা তো দূরে থাক, বুঝতেও পারতেন না। ২০ হাজার মানুষের আশ্রয়সহ খাদ্য-বস্ত্রের কর্মযজ্ঞে খুব ভালো ইংরেজি ভাষা জানা দ্বিজেন রায় শরণার্থীদের সেবায় দোভাষীর কাজ করেন ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথম শরণার্থী যাত্রী হিসেবে এ দম্পতি তাদের এক মাসের প্রথম সন্তান দেব দুলালকে নিয়ে ঝালকাঠি স্টিমারঘাটে পৌঁছান।
এরপর জীবনের নানা নাটকীয়তার গল্পের দৃশ্যপট থেকে দ্বিজেন রায় জানান, স্বাধীনের পর দেশে এসে অভাব আর অভাব। বাড়িঘর নেই, খাবার নেই। তবে পুরোনো স্কুলের শিক্ষকতা ফিরে পান। আর সেইসাথে ৩শ’ টাকা বেতন-ভাতাও। যখন দেশের বেশিরভাগ মানুষের আধাপেট খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে তখন সন্তানসহ এ দম্পতি অন্যের বাড়ির আঙিনায় ঠাঁই হলেও চাল-ডাল কিনে বেশ ভালোভাবেই সংসার শুরু করেছিলেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে কেন পড়ে থাকলেন তখনকার দিনের দরিদ্র পেশা শিক্ষকতায়? এ প্রশ্নের উত্তরে দ্বিজেন রায় বলেন, ‘যুদ্ধের পর ভালো কোনো পোশাক কিনতে পারিনি। একটা ছেঁড়া পাজামা আর পাঞ্জাবি পড়ে রোজ স্কুল করতে হয়েছে। চাকরির সন্ধানে ঢাকায় যাওয়ার জন্য অসুস্থ স্ত্রী এবং শিশু সন্তানকে গ্রামে রেখে যেতে চাইলেও যুদ্ধ শেষে চরম অভাবের কারণে স্বজনদের কাছে তাদের ঠাঁই হয়নি।’ এদিকে শরণার্থী শিবিরে কাজ করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী যে সনদপত্র দিয়েছিল সেটাও ডাকাতরা একরাতে স্কুলের মাইনের সাথে ট্রাঙ্কসহ নিয়ে যায়। আর তারপর ৭৫-এর পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে তালিকাভুক্ত করতে সাহস পাননি। তবে ১৯৭৯ সালে স্ত্রী সন্ধ্যা রানির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি হয়। আর সেই থেকে ডিএল রায় ২৮ কলেজ-স্কুলের বিভিন্ন পদে ৪২ বছর এবং সন্ধ্যা রানি ৩১ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে অবসর নেন। আর এরইমাঝে ৪ সন্তান্তের লেখাপড়া আর বিয়ে দিয়ে কখন যে কেটে গেছে এতগুলো বছর ভেবেই পান না তারা। ডিএল রায় আরো বলেন, ‘লাট সাহেবের বিলাতী তিন পা ওয়ালা কুকুরের পেছনে ৭৫ টাকা মাসিক খরচ আর শিক্ষকের বেতন ২৫ টাকা। পণ্ডিত মশাইয়ের সে গল্পের মতো আমরা শিক্ষক দম্পতি চরম দারিদ্রতায় সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে কাটিয়ে দিয়ে আজ ১৫ বছরের অবসর জীবন।’
অনেকটা নিভৃতচারী এ দম্পতি ঝালকাঠি শহরের অনেকের কাছেই পারিবারিকভাবে অপরিচিতি। তবে রাস্তা দিয়ে চলাচলে কিংবা বাজার-ঘাটে ছোট্ট এ শহরের তারা পরিচিত মুখ। অনেকের কাছে প্রিয় দিদিমণি-স্যার, কারো কাছে হাত ধরে পথচলা ‘সেই দম্পতি’। এ বয়সে দাম্পত্যজীবনেরও উদাহরণ তারা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার কথা থাকলেও নিয়ন্ত্রিত জীবনের কারণে এখনো বাজার-সদাই, ব্যাংকের টাকা উত্তোলনসহ সংসারের প্রায় সব কাজই দু’জনই হাতে হাত রেখে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই দুই জোড়া একই হাত ধরে পার করেছেন সংসার জীবনের ৪৯ শীত-বসন্ত। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের অনুভূতি জানতে চাইলে এ শিক্ষক দম্পতি বলেন, ‘আমাদের কাছে বছরের ৩৬৪ দিনই ভালোবাসা দিবস। সংসারের চড়াই-উত্রাই, সুখ-দুঃখের সংগ্রামে বিশ্বাস আর আস্থায় এক একটি দিন পার করার নামই ভ্যালেন্টাইন ডে। তবে মিডিয়া কিংবা তরুণ-তরুণীদের কাছে প্রাধান্য পাওয়া বিশেষ এদিনটি তাদের কাছে এ বয়সেও যেন একটু বিশেষভাবে আন্দোলিত করে, জানান তারা।
৪ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে প্রবাসী। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। একজন শিক্ষক, আরেকজন গৃহিণী। আর তাদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান এ গল্পের লেখক নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এই দম্পতি অর্থাত্ তার বাবা-মায়ের সাথে তাদের সুখ-দুঃখের ভ্যালেন্টাইনের একজন সাক্ষী।
