অতএব, মৃত্যুর সময় যার জন্ম, তার মৃত্যু নেই, এটা ভেবেই বরং এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো যাক। যদি বলি, ছোটকাগজের জন্ম মূলত ছোট লেখকের পেইন থেকেই শুরু হয়। কেননা, পাঠ ও পাঠক চিন্তা করে ছোটকাগজের কনসেপ্ট তৈরি হয়নি, হবেও না—কখনো। তবে কিছু নিরীক্ষাপ্রবণতায় জারিত নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা থেকেও এর যাত্রারম্ভ হয়। তাই, যে কেউ চাইলেই, ছোটকাগজের উদ্দেশ্যগুলো হেডিংবোর্ডে টাঙানো রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিজ্ঞাপনের মতো দেখতে পারবেন না। কারণ, এর ক্ষোভ-বিক্ষোভ, ক্ষত-বিক্ষত যন্ত্রণাগুলো এনেস্থেসিয়ায় স্থির থাকে। কিংবা এই কাগজের এতটাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পক্ষাঘাত থাকে, যা খালিচোখে কোনোভাবেই দেখা সম্ভব নয়।
আমাদের ছোটকাগজের চিন্তাগুলো—ছোটরাই করে বটে। তবে, এই চিন্তার ব্যাপ্তি মোটেই ছোট কিছু নয়। অনেক বিশাল এর ঐশ্বর্যময়তা। যার গভীরতা-উদারতা উপলব্ধি সব পাঠকের সবার অন্তরের উজ্জ্বলতা নয়। একটি ‘লিটল বয়’ হিরোসিমা ধ্বংসের জন্যে জরুরি হলে, সাহিত্যের প্রথাগত/ তথাকথিত এলিট ঐতিহ্য ভাঙনের জন্যেই একটি সত্/ শুদ্ধচিন্তার (লিটল ম্যাগাজিন) ছোটকাগজ এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। অবশ্য এজন্যে এই কাগজের বারুদশালা, চিন্তা ও দর্শনগুলোও পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক রাখতে হয়। যার মধ্যে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান-পরনির্ভরতা—ভোগ এবং ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই উসকে উঠবে না। আবার, স্রেফ আঁতলামি, অহংবোধ, গোষ্ঠীতন্ত্রে আক্রান্ত অস্থিরতাও দায়বদ্ধ কোনো ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্য নয়। মূলত সৃজনশীল ছোটকাগজের চিন্তার পরিধি ও এর ব্যাপকতার পথ খুবই সরু, দুর্গম ও দুস্তরও বটে। তাই, প্রকৃত ছোটকাগজের কনসেপ্ট মানেই : সে লেখকের ভালো লেখাটি ছাপতে চায়—নিজেদের সাথে প্রথম সংযোগের আনন্দ খুঁজে নিতে। যার কোনো রুদ্ধতা নেই। মেনিফেস্টোও নেই...। তার মানে ছোটকাগজের ভালবাসা কেবল বহুগামী নয়; সমৃদ্ধ—বহুগামী! ছোটকাগজ সম্পাদনার প্রবণতা প্রথমত ছাপার স্পেস-জনিত সমস্যার ফলাফল। তাহলে, আবার প্রশ্ন হতে পারে, কারা ছোটকাগজ সম্পাদনা করে? এক অংশ বড়কাগজে জায়গা পায় না বলে। অন্য অংশ তথাকথিত কাগজে জায়গা নেয় না। যারা জায়গা পায় না—তারা শো-বিজ আক্রান্ত বিশেষণ-লোভী। (ড্যাসের কবি... ড্যাসের সম্পাদক হতে চান) সাহিত্য নির্মাণ তাদের কাছে মুখ্য নয়। অন্য অংশ নতুন ধরনের ক্লাসিক তৈরি করার চিন্তায়; অভিনব উচ্চারণ নিয়ে ছোটকাগজ সঙ্গী করে এগোয়। কারণ আর কিছু নয়। ঐসব কাগজ যেমন আপোসহীন এই লেখকদের চেনে না। নিরাপসকারীরাও চিন্তাবিশ্বের বহুমাত্রিকতার কারণে তাদেরকে বর্জন করে। মৌলিক লেখক সর্বত্রই দ্বিতীয় পক্ষের সম্পাদকদের দলে। কেননা, সম্পাদনা মোটেই গৌণ আনন্দ নয়। কারণ, ছোটকাগজ করার প্রক্রিয়ায় শিল্পের বেসাতিটা—বরাবরই আত্মসমীক্ষণের। সেইসব সত্ গোষ্ঠীতন্ত্রহীন উত্কৃষ্ট লেখকের শ্রেষ্ঠ লেখাটি পাঠ করা এবং সেইসব উত্কৃষ্ট পাঠককে ছোটকাগজের সঙ্গে ইনভলভ করাই হচ্ছে ছোটকাগজ সম্পাদনা চিন্তার—প্যারালাল। নিরীক্ষানির্ভর—একগুঁয়ে কিন্তু নয়—মৌলিক বরং বাণিজ্যিকও নয়—বরং পুরোপুরি কনট্রিবিউশন-ই হচ্ছে প্রতিটি সম্পাদনার দায়িত্ব। অবশ্য ছোটকাগজের ক্ষেত্রে সেই বিপ্রতীপ সৌন্দর্য ও আনন্দ খুঁজে পেতে অনেক দুস্তর পথ চলতে হয়। কিন্তু ছোটকাগজের সমস্যা মূলত সেই প্রথমপক্ষরা। শো-বিজ আক্রান্ত যারা দলবাজি— প্রপাগাণ্ডা করে, পাঠককে ছোটকাগজ সম্পর্কে ভুল ধারণা সরবরাহের মাধ্যমে সমস্যা তৈরি করে। আরো সমস্যা হচ্ছে—কনসেপ্ট। সম্পাদকীয় লেভেল পৃষ্ঠপোষকতায় কতটা কন্ট্রোল ক্ষমতা আছে কিংবা নেই। মুশকিলটা হলো যারা তরুণ তাদের কাছ থেকে কী পরিমাণ আশা করা যায় অথবা এখনকার তরুণরা ঐ পরিমাণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত কি না। আমাদের সময় তরুণরাই ছোটকাগজ করতেন এবং ঐ সময় বহু পত্রিকা প্রথম প্রকাশেই অনেককে চমকে দিয়েছিল। এখন তরুণদের অনুভবের স্তরেই গোলমেলে অবস্থা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন কারণে, গ্লোবালাইজেশনের খারাপ চর্চা করে। যা ব্যাখ্যা করে না বললেও চলে। আজকাল এগুলো এত বেশি দৃশ্যমান যে, অন্ধরাও দেখতে পাচ্ছে। ছোটকাগজ করা, না করা একজন লেখকের অথবা সম্পাদকের স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হতে হয়। যা কখনো কখনো উত্তেজনা এবং প্রতিবাদের দায় হওয়া উচিত। শুধু তা-ই নয়, আরো অনেক কিছু—লেখক এবং পাঠকের ভিতর মিশ্রিত হতে হয়। তাছাড়া, পাঠকও বেড়েছে অনেক। হয়তো তারা সিরিয়াস বই এবং ছোটকাগজ পড়ে নিজের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সাজিয়ে ভেতরে ভেতরে উত্কৃষ্ট হয়। অবার, ছোটকাগজের ভুল ব্যাখ্যায় আমাদের— ফ্যাক্টরগুলো কাজ করছে না। এখনকার কোনো কোনো তরুণ ছোটকাগজকে নিজের লেখকসত্তা তৈরির কাজে পরিণত করছে বলেই—মানসম্মত ছোটকাগজের এই দশা। ফলে, শিল্পমান হারাচ্ছে অধিকাংশ সাহিত্যের ছোটকাগজ।
কে, কীভাবে প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা দেয়, জানি না। সাহিত্যকর্মী এবং একজন ছোটকাগজ সম্পাদক হিসেবে বরাবরই মনে হয়েছে—একটি ছোটকাগজ যদি চিন্তার পথগুলো আটকে দেয়, নার্সিসিজম এবং দলবাজিতে আক্রান্ত হয়। যারা সাহিত্য নির্মাণে মনোযোগ না দিয়ে, লেখক বিরোধ সরবরাহ করে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বে দ্রবীভূত হয়ে সাহিত্য বিচারে আমলাতন্ত্র আরোপ করে—তবে ঐ ছোটকাগজ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। যার রূপ—ভয়াবহ! কিন্তু আজকাল ছোটকাগজের নামে অধিকাংশই হচ্ছে করে খাওয়ার চেষ্টা। কেউ এর থেকে লিফট নিচ্ছে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে। মোটা কাগজে রদ্দি ছাপিয়ে পৃষ্ঠাভরে পায়ের তলায় রেখে উপরে ওঠার দেয়াল টপকাচ্ছে। অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আওড়াতে আওড়াতে এরাই আবার সেই এস্টাবলিশমেন্টের সুবিধাদি ভেঙে খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের—দপ্তরে দপ্তরে। যদি বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো মনে করত যে, ছোটকাগজ তার শত্রু—তাতে বরং তার দেউলিয়া অবস্থা প্রমাণিত হতো। তবুও, অবাক লাগে যে, ছোটকাগজ সম্পাদকরা এইসব কথা বলে, লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভ্রমহানি করে বাণিজ্যিক পত্রিকাকে সম্মান দেখায় কেন? ছোটকাগজের সাথে বাণিজ্যিক পত্রিকাকে— এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত করা মূর্খ সম্পাদকের জ্ঞানচর্চা বলা যায়। তবে, অতিক্রমের ক্ষেত্রে যদিও—একথা বলা যায়, একটি ছোটকাগজ—অন্য একটি ছোটকাগজকে বিভিন্নভাবে অতিক্রম করে যেতে পারে। আমাদের মধ্যে এই অতিক্রম করার প্রবণতা তো দূরের কথা, উল্টো একটি ছোটকাগজ অন্য একটি ছোটকাগজকে সহ্য করার ক্ষমতাই অর্জন করেনি। বরং নিজের চরিত্র হারিয়ে অন্যের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং একে অন্যকে তাচ্ছিল্য করছে। যে জন্য এখন হামেশাই মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আমাদের মন্ত্রময় ছোটকাগজের সাহিত্য নির্মাণ—নক্ষত্রের পথগুলো...। মূলত, বাংলাদেশের ছোটকাগজ মরে গেছে। মরে যাচ্ছে— লেখক-শূন্যতায়। এর জন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া বহু ছোটকাগজ যতটা দায়ী—ততটাই দায়ী লেখক এবং সম্পাদকীয় মূর্খতার অনিশ্চয়তাও...।
