সম্প্রতি প্রশ্ন উঠিয়াছে—চাঁদ তুমি কাহার? প্রশ্ন শুনিয়া বাঁধ ভাঙিতে পারে চাঁদের হাসির। কোটি কোটি বত্সর ধরিয়া সূর্যের আলো ধার করিয়া পৃথিবীতে মায়াবী আলো ছড়াইবার মাধ্যমে চাঁদ হইয়া উঠিয়াছে এই নীলগ্রহের সবচাইতে প্রিয়তম মহাজাগতিক বস্তু।
পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক এই উপগ্রহ ঘিরিয়া সেই প্রাচীনকাল হইতে মানুষের কৌতূহলের সীমা নাই। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে চাঁদের গুরুত্বও কম নহে। এমনকী ধর্মীয় জীবনেও। পৃথিবীকে ঘিরিয়া চাঁদের ঘূর্ণনের হিসাব ধরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে চান্দ্রবর্ষ। চাঁদের তিথি মানিয়াই পৃথিবীর অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম ইসলামের যাবতীয় রীতিনীতি অনুসরণ করা হয়। হিন্দুধর্মেরও যাবতীয় পূজা-প্রার্থনা চলে চন্দ্রের কলার হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে। চাঁদের কলার বৃদ্ধি-হ্রাস পৃথিবীর পরিবেশের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এমনকী সেই প্রভাব ধরা পড়ে মানুষের শারীরবৃত্তির উপরও।
চাঁদ লইয়া গড়িয়া উঠিয়াছে কত রূপকথা। ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে অ্যাপোলো-১১ চন্দ্রাভিযানের মাধ্যমে চাঁদে প্রথম পা রাখে মানবজাতি। ১৯৭২ সালের পর চাঁদে আর কোনো মানুষের পা পড়ে নাই। সম্প্রতি চাঙ্গ-এ ফোর নামে চীনের একটি নভোযান চাঁদের অপর পিঠে নামিয়াছিল। চন্দ্রপৃষ্ঠে একটি কৃত্রিম জীবমণ্ডল স্থাপন করিয়া সেইখানে একটি চারা গাছ রোপণ করিতে সক্ষম হয় ওই চন্দ্রযানটি। যদিও তুলাগাছের সেই অঙ্কুরটি বাঁচে নাই বেশি দিন। চাঁদে অভিযান চালাইয়া সোনা, প্লাটিনাম আর দুর্লভ সব ধাতু আহরণ করা সম্ভবপর হইতে পারে—এমন হিসাবনিকাশ প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে চলিতেছে অনেক দিন ধরিয়া। সত্যি কথা বলিতে, ১৯৬৯ সালে চাঁদে জমির মালিকানা বা খনির অধিকারের বিষয়টি তেমন একটা গুরুত্বও বহন করিত না। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির ফলে খনি আহরণ এখন অনেক দেশের নিকটই লাভজনক হইয়া উঠিতে পারে। যদিও ১৯৭৯ সালে চাঁদ ও মহাশূন্যের অন্যান্য বস্তুতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করিবার ক্ষেত্রে সমঝোতা প্রস্তাব আনিয়াছিল জাতিসংঘ, যাহা ‘মুন এগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত। সেইখানে মূল বিষয় ছিল—চন্দ্রাভিযান হইতে হইবে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এবং কোনো মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ করিতে হইলে আগে জাতিসংঘকে জানাতে হইবে কেন এবং কোথায় তাহারা উহা বানাইতে চায়। ওই চুক্তিতে আরো বলা হইয়াছিল যে, চাঁদ এবং ইহার সকল প্রাকৃতিক সম্পদে মানবসভ্যতার সকলের সমান অধিকার থাকিবে। তবে ওই চুক্তিটির সমস্যা হইল, মাত্র ১১টি দেশ ইহাকে স্বীকৃতি দিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন এবং রাশিয়ার মতো মহাকাশ গবেষণার প্রধান দেশগুলি সমর্থন করে নাই ওই চুক্তি।
তাহা ছাড়া, বেসরকারি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মহাকাশে যে-কোনো কর্মকাণ্ড চালাইবার জন্য নিজ নিজ দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমতি লইবার নিয়ম আছে। অন্যদিকে কোনো দেশের সরকারই এখন অবধি মহাজাগতিক সমপত্তির মালিকানা সংবলিত ‘দলিলপত্রের’ স্বীকৃতি দেয় নাই। তাহার পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চাঁদ, মঙ্গল কিংবা অন্যান্য মহাজাগতিক সম্পত্তি বিক্রয়ের চেষ্টা চালাইয়া আসিতেছে। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের কারণে চাঁদের ব্যাপারে এই চেষ্টা দিন দিন আরো বাড়িবে বলিয়া মনে হইতেছে।
