সত্তরের দশকে অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝাত, তা এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রত্যন্ত, দুর্গম এলাকার গ্রামও এখন পাকা সড়ক দিয়ে সংযুক্ত হয়েছে শহরের সঙ্গে। যে গ্রামে কুপি বাতিও জ্বলত না সব ঘরে প্রয়োজনীয় তেলের অভাবে, এখন সেখানে হয় পল্লী বিদ্যুত্ নয়ত সৌর বিদ্যুতের আলো ঝলমল করে। যে গ্রামে ডাকে চিঠি, টেলিগ্রাম, মানি অর্ডার পৌঁছাতে অনেক দিন লেগে যেত, সেই গ্রামেও আছে এখন মোবাইল ফোনের কাভারেজ, বিকাশের মাধ্যমে মুহূর্তেই প্রিয়জনের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার সুযোগ। পালাবদল ঘটেছে গ্রামীণ অবকাঠামোতে, খাদ্যের প্রাপ্যতায়, জীবনযাত্রার মানে, যোগাযোগ ব্যবস্থায়, শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যে। কুঁড়েঘরের জায়গায় এসেছে টিনের ঘর। প্রায় প্রতি বাড়িতেই রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা। কলেরা বসন্তের মতো মহামারী বিদায় নিয়েছে। আগে যেখানে হাঁটা কিংবা নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না, এখন গ্রামের মানুষ হরদম যন্ত্রচালিত বাহনে চড়েন। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে জীবনটাকে নষ্ট করে দিতে রাজি নন বেশিরভাগ বাবা-মা। বাল্যবিয়ের হার কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
শুধু কৃষিকাজ নয়, গ্রামের মানুষ এখন বহু ধরনের পেশায় নিজেদের যুক্ত করে জীবন বদলে দিচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও চলে গেছে ব্যাংকের সেবা। উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে গ্রামের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাও। গ্রাম মানেই এখন আর কৃষি কাজ নয়। এক দশক আগেও বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা এখনকার মতো অতোটা চাঙ্গা ছিল না। তখন শহরের অর্থনীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে বিরাট পার্থক্য ছিল। অভাব, দুঃখ, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা, পশ্চাত্মুখী সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের অচলায়তন সৃষ্টি করে রেখেছিল। বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বলা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নবজাগরণ এসেছে। যার ফলশ্রুতিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এতে করে উত্পাদনের পরিমাণ বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। কৃষি খাতে তো অবস্থা ভালোই, এমনকি কৃষির বাইরেও গ্রামীণ অর্থনীতি বর্তমানে চমত্কার ভালো অবস্থায় রয়েছে। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে এখন কৃষির পাশাপাশি ছোট ছোট শিল্প স্থাপনের প্রতি আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সমপ্রসারিত হচ্ছে।
স্রেফ কৃষিজাত পণ্য উত্পাদন নয়, এর পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, মত্স্য চাষের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ তাদের ভাগ্য উন্নয়নে পুরোপুরি সচেষ্ট বলা যায়। আজকাল প্রায় প্রতিটি গ্রামেই হাঁস-মুরগির খামার, দুগ্ধ উত্পাদনকারী ডেইরি ফার্ম, মত্স্য চাষ প্রকল্পের ছড়াছড়ি লক্ষ করা যায়। এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ।
এখন তারা তাদের প্রতিটি মুহূর্ত নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে ব্যয় করছেন। মাঠে কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রামের মানুষ পোলট্রি ফার্ম ও ডেইরি ফার্মেও প্রয়োজনীয় সময় দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে উপার্জনের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে গ্রামাঞ্চলে। শুধু আম আর কাঁঠাল নয়, গ্রামে এখন ফলন হচ্ছে বাউকুল, স্টবেরি, ড্রাগন ফলের মতো বিদেশি নতুন অনেক ফল। শুধু লাউ কুমড়া নয় গ্রামের কৃষক এখন ক্যাপসিকাম, গ্রীষ্মের টমেটো ফলানোর মতো নতুন নতুন প্রযুক্তি আয়ত্তে এনেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এখন প্রত্যন্ত অনেক গ্রামের উত্পাদিত কৃষিজাত পণ্য, পোলট্রি শিল্পের উত্পাদিত ডিম, হাঁস-মুরগি এবং ডেইরি ফার্মে উত্পাদিত দুধ খুব দ্রুতই শহরে পৌঁছে যাচ্ছে।
উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে ফসল উত্পাদনের পরিমাণ বেড়েছে অনেক। সব কিছুই মিলিয়ে গ্রামের কৃষক ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত মানুষদের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকায় তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ক্রমেই বাড়ছে। আজকাল গ্রামাঞ্চলে তরুণ যুবক-যুবতীরা নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করছে। তাদের এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মুরগির খামার, কৃষি খামার, উন্নতজাতের গাভী পালনের মাধ্যমে দুগ্ধ উত্পাদন খামার, মত্স্য খামার, মৌমাছি চাষের মাধ্যমে মধু উত্পাদন, ফুল ও ফলের বাগানসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে-একথা না মেনে উপায় নেই। চাকরির আশায় বসে না থেকে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের অনেকেই সংসারের জন্য উপার্জন করছে। তারা শিক্ষিত এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় গ্রামে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল মজুতদারদের কাছে উত্পাদিত পণ্য বিক্রি না করে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে শহরে নিয়ে বিক্রি করছেন। এতে তারা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমোন্নতি বিরাট ভূমিকা পালন করছে।
যেখানে বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে শুরু করে শহুরে জীবনের মতো উন্নত নানা সুযোগ-সুবিধা থাকছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে গ্রামীণ জীবনযাপনে আধুনিকতার ছাপ ক্রমেই সুস্পষ্ট হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের চেহারাটাই বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এখন গ্রামের ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে মেধা ও যোগ্যতার বলে জীবনে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তারা শহরের বড় বড় পদে চাকরি করছে। বড় বড় ব্যবসায় নিয়োজিত হচ্ছে। তারাও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে।
n লেখক: ব্যাংকার
